ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ

কলকাতায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, রাতে ঘুমের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই কলকাতার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষ দক্ষিণ কলকাতায় তাঁর বাড়িতে ভিড় করেন।

দুপুরে তাঁর প্রিয় পোষাক পাগড়ী আর কালো পাঞ্জাবী পরিয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষের মরদেহ প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিমবঙ্গ চলচিত্র কেন্দ্র নন্দনে। বহু মানুষ সেই শেষ যাত্রায় সামিল হয়েছিলেন।

নন্দন চ্ত্বরে বহু সাধারন মানুষ – বিভিন্ন সংগঠন – চলচিত্র জগতের মানুষ তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দীর্ঘক্ষন ধরে।

“আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সব থেকে ভাল পরিচালক৻ এত কম বয়সে যে কী করে চলে গেল – ভাবতেই পারছি না।”

পরিচালক গৌতম ঘোষ

নন্দন থেকে তাঁর দেহ নিয়ে যাওয়া হয় টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় – টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওতে কিছুক্ষণ রাখার পরে শেষকৃত্যের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় কাছেই সিরিটি শ্মশানে।

কলকাতা পুলিশ বিউগলে লাস্ট পোস্ট বাজিয়ে আর তিনবার গান স্যালুট দিয়ে শেষ অভিবাদন জানায় এই পরিচালককে।

বিজ্ঞাপন থেকে চলচ্চিত্রে

চলচ্চিত্র জগতে আসার আগে ঋতুপর্ণ ঘোষ কাজ করতেন বিজ্ঞাপন জগতে আর সেই সময় থেকেই তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব বর্তমানে সংসদ সদস্য ডেরেক ও ব্রায়ানের।

“আমি আশির দশক থেকেই ঋতুকে চিনি। আমরা দুজনেই দুটো আলাদা বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করতাম। কিন্তু যখনই কোনও বিজ্ঞাপন বাংলায় অনুবাদ করতে হোত, তখন আমরা ঋতুকে ডাকতাম। কাছাকাছি পাড়াতেই থাকি। তাই আমার বাড়ীতেও আসত,” বলছিলেন ডেরেক ও ব্রায়ান।

বিজ্ঞাপন জগত ছেড়ে প্রথম ছবি করেছিলেন হীরের আঙটি । আর তারপরেই উনিশে এপ্রিল। এটি ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রথম জাতীয় পুরষ্কার এনে দেওয়া চলচ্চিত্র।

উনিশে এপ্রিল ছায়াছবির অন্যতম অভিনেত্রী দেবশ্রী রায় কান্না ভেজা গলায় বলছিলেন, “সেই উনিশে এপ্রিল থেকে শুরু আমার আর ঋতুর বন্ধুত্ব। সেই সব স্মৃতি কখনোও ভুলতে পারব না। আমি ধাক্কাটা নিতে পারছি না। ভাবতেই পারছি না যে ওর ‌আর নেই।”

“সেই উনিশে এপ্রিল থেকে শুরু আমার আর ঋতুর বন্ধুত্ব। সেই সব স্মৃতি কখনোও ভুলতে পারব না।”

অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়

মি. ঘোষের বাড়ীর সামনে অনেকেই বলছিলেন, উনিশে এপ্রিল ছবির শুরুটা হয়েছিল একটা মৃত্যুর দৃশ্য দিয়ে – যেখানেও মৃত্যুর সময়ে সেই মাঝরাত – অনেকটাই পরিচালকের মৃত্যুর মতোই।

উনিশে এপ্রিল দিয়ে শুরু করে দহন, উৎসব, চোখের বালি, অন্তরমহল, সব চরিত্র কাল্পনিক, নৌকাডুবির মতো একের পর এক ছবি তৈরি করেছেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর ১২ টি চলচ্চিত্র জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছে। এছাড়াও পেয়েছেন বহু আন্তর্জাতিক পুরষ্কার এবং সম্মান।

অভিনেতা কৌশিক গাঙ্গুলি বলছিলেন নব্বইয়ের দশকের গোড়া অবধি বাংলা ছায়াছবিতে যে বন্ধ্যাত্ব চলছিল, সেটা কাটিয়ে উঠে দর্শককে আবারও সিনেমা হলের দিকে আকৃষ্ট করতে ঋতুপর্ণ ঘোষের অবদান ছিল অসামান্য।

মাত্র ৪৯ বছর বয়সে ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যু তাই মানতে কষ্ট হচ্ছে অনেকের মতোই চলচিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষেরও।

তাঁর কথায়, “আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সব থেকে ভাল পরিচালক। এত কম বয়সে যে কী করে চলে গেল – ভাবতেই পারছি না। আর শুধুতো ছবি নয়, সমকামীদের যুদ্ধেও ওর অবদান রয়েছে – সেটা ভুললে চলবে না।”

লিঙ্গ পরিচয় বিতর্ক

যৌনতা নিয়ে নিজের স্পষ্ট চিন্তাভাবনা কোনওদিন লুকিয়ে রাখেন নি ঋতুপর্ণ ঘোষ।

আগে পুরুষদের পোষাক পড়লেও বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি মহিলাদের পোষাকই পরতেন। এজন্য তাঁকে নিয়ে অনেকে ঠাট্টা তামাশা করলেও তিনি নিজের চিন্তাভাবনা থেকে সরে আসেন নি এবং নিজের শর্তেই জীবন কাটিয়েছেন। উল্টে, তাঁকে নিয়ে যাঁরা মজা করেছেন, তাঁদের সঙ্গে মুখোমুখি তর্কও করতেন।

যেমনটা হয়েছিল টেলিভিশনের জনপ্রিয় কমেডি শোয়ের উপস্থাপক মীরের সঙ্গে। একটি অনুষ্ঠানে মীর ঋতুপর্ণ ঘোষকে নকল করে মস্করা করার পরে নিজের টেলিভিশন অনুষ্ঠান ঘোষ এন্ড কোম্পানীতে আহ্বান করে মীরের সঙ্গে তর্ক করেছিলেন। সেই মীরও আজ বলেছেন, “তোমাকে মিস করব ঋতুদা।”

তাঁর মৃত্যুতে অগণিত চলচ্চিত্রপ্রেমী যেমন আজ শোক পেয়েছেন, তেমনই সমকামী ও হিজড়াদের সংগঠনগুলি বলছে তারা হারালেন স্বজনকে – যিনি নিজের লেখা, ছবির মাধ্যমে বারবার তাঁদের মতো মানুষদের খাটো করে দেখানোর প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন।

ছায়াছবির পাশাপাশিই বাংলা সাময়িক পত্রিকা সম্পাদনাও করতেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগরক্ষাকারী সাইটগুলোতেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয়। মাত্র দুদিন আগে তিনি টুইটারে লিখেছিলেন, “সত্যান্বেষী’র শুটিং শেষ”।,  শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে তৈরী হচ্ছিল তাঁর সর্বশেষ ছবি।

সেই ছবি অসমাপ্ত হয়ে থাকার ফলে গতবছর তৈরী ছবি চিত্রাঙ্গদাই হয়ে রইল তাঁর শেষ ছায়াছবি – যার জন্য বিশেষ জুরি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন জাতীয় চলচিত্র পুরষ্কারে। তিনি নিজে অভিনয়ও করেছিলেন চিত্রাঙ্গদায় – যেখানে ঋতুপর্ণ ঘোষের গলায় একটি সংলাপে ছিল.. “তাহলে আসি, হ্যাঁ?”

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s