রূপান্তরকামিতা

রূপান্তরকামিতা (ইংরেজি: Transsexualism ট্রান্সেক্সুয়্যালিটি) বলতে বিশেষ একটি প্রবণতা বোঝায় যখন সেক্স বা ‘জৈব লিঙ্গ’ ব্যক্তির জেন্ডার বা ‘সাংস্কৃতিক লিঙ্গ’-এর সাথে প্রভেদ তৈরি করে । ট্রান্সেক্সুয়াল বা রূপান্তরকামী মানুষেরা ছেলে হয়ে (বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যে) জন্মানো সত্ত্বেও মনমানসিকতায় নিজেকে নারী ভাবেন (কিংবা কখনো আবার উল্টোটি- নারী হিসেবে জন্মানোর পরও মানসিক জগতে থাকেন পুরুষসুলভ)। এদের কেউ কেউ বিপরীত লিঙ্গের পোষাক পরিধান করেন, এই ব্যাপারটিকে বলা হয় (ট্রান্সভেস্টিজম / ক্রসড্রেস), আবার কেউ সেক্স রিঅ্যাসাইনমেন্ট সার্জারির মাধ্যমে রূপান্তরিত মানবে (Transexual)পরিণত হন। এরা সকলেই বৃহৎ রূপান্তরপ্রবণ সম্প্রদায়ের (Transgender) অংশ হিসেবে বিবেচিত।

প্রাণীজগতে রূপান্তরকামিতা
বিজ্ঞানীরা প্রাণিজগতে রূপান্তরকামিতার উপস্থিতি লক্ষ্য করেছেন। উত্তর আমেরিকার সমুদ্রোপুকূলে আটলাণ্টিক স্লিপার শেল (Atlantic Slipper Shell) নামে পরিচিত ক্রিপিডুলা ফরমিক্যাটা (Crepidula Fornicata)এবং ল্যাবারিডেস ডিমিডিয়াটাস (Laborides dimidiatus), ইউরোপিয়ান ফ্লে অয়েস্টার (European Flay Oyster) ও অস্ট্রা এডুলিস (Ostrea edulis) প্রজাতির ঝিনুকের মধ্যে রূপান্তরকামিতা এবং লিঙ্গপরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে । যৌনতার পরিবর্তন ঘটে মাছি, কেঁচো, মাকড়শা এবং জলজ ফ্লি ডাফনিয়াদের বিভিন্ন প্রজাতিরে মধ্যেও । লিঙ্গ পরিবর্তনকারী মাছের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কোরাল রিফে (প্রবালের খাঁজ) বসবাসকারী গ্রুপার মাছ। এ গ্রুপার মাছ প্রথমে স্ত্রী হিসেবে জন্মগ্রহণ করে ও পরিপকস্ফতা লাভ করে এবং এক বা একাধিকবার প্রজননে অংশ নেয়। এসব স্ত্রী মাছ পরে লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুরুষ মাছে রূপান্তরিত হয় এবং সক্রিয় পুরুষ মাছ হিসেবে প্রজননে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের সমুদ্রে প্রবালের খাঁজে ভেটকি বা কোরাল মাছও ওইভাবে লিঙ্গ পরিবর্তন করে বলে জানা গেছে। জাপানের ওকিনাওয়ার রিউকিউ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আলম এ নিয়ে গবেষণা করেছেন। ।

মানবসমাজে রূপান্তরকামিতা
মানবসভ্যতার বিভিন্ন সমাজব্যবস্থায়[৭] লিখিত ইতিহাসের সমগ্র সময়কাল জুড়ে রূপান্তরকামিতার উপস্থিতি লক্ষিত হয়। এর মধ্যে আমেরিকার পুরুষ রূপান্তরকামী জর্জ জরগেন্সেন এর ক্রিস্টিন জরগেন্সেনের রূপান্তরিত হবার কাহিনী মিডিয়ায় এক সময় আলোড়ন তুলেছিলো । এ ছাড়া জোয়ান অব আর্ক, জীববিজ্ঞানী জোয়ান (জনাথন) রাফগার্ডেন, বাস্কেটবল খেলোয়ার ডেনিস রডম্যান, চক্ষুচিকিৎসক এবং পেশাদার টেনিস খেলোয়ার ডঃ রেনি রিচার্ডস, সঙ্গিতজ্ঞ বিলিটিপটন সহ অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তির মধ্যে রূপান্তরপ্রবণতার উল্লেখ ইতিহাসে পাওয়া যায়। ১৯৬০ সালে মনোচিকিৎসক ওয়ালিন্দার রূপান্তরকামীদের উপরে একটি সমীক্ষা চালান। তার এই সমীক্ষা থেকে জানা যায়, প্রতি ৩৭,০০০ এ একজন পুরুষ রূপান্তরকামীর জন্ম হচ্ছে অন্যদিকে প্রতি ১০৩,০০০-এ একজন স্ত্রী রূপান্তরকামীর জন্ম হচ্ছে। ইংল্যান্ডে এ সমীক্ষাটি চালিয়ে দেখা গেছে যে সেখানে প্রতি ৩৪,০০০ এ একজন পুরুষ রূপান্তরকামী ভূমিষ্ট হচ্ছে আর অন্যদিকে প্রতি ১০৮,০০০ এ একজন জন্ম নিচ্ছে একজন স্ত্রী রূপান্তরকামী। অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডে গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে সেখানে ২৪,০০০ পুরুষের মধ্যে একজন এবং ১৫০,০০০ নারীর মধ্যে একজন রূপান্তরকামীর জন্ম হয়।

সেক্স বনাম জেন্ডার বি্রোধ

সমাজবিজ্ঞানী অ্যান ওকলের মতে, সেক্স শারীরিক বৈশিষ্ট্য বহন করে। আর জেন্ডার একটি নির্দিষ্ট সমাজে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নির্ধারিত বিশিষ্টতা নির্দেশ করে।একজন নারী ও পুরুষের কার কী রকম পোশাক-পরিচ্ছদ হবে; কে কী রকম আচার-আচরণ করবে; আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশা কার কী রকম হবে; সমাজের নানা ধরনের কাজে একজন নারী বা একজন পুরুষের ভূমিকা কী হবে এই বিষয়গুলো নির্ধারণ করে জেন্ডার।

অর্থাৎ, সেক্স বিষয়টি পুরোপুরি শরীরের উপর নির্ভরশীল কিন্তু জেন্ডার নির্ভরশীল সমাজের উপর। যেহেতু নারী বা পুরুষের দায়িত্ব, কাজ ও আচরণ মোটামুটি সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত হয়, তাই সমাজ পরিবর্তন বা সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে জেন্ডার ধারণা বদলে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ- আমরা যখন কাউকে ‘নারী’ বা ‘পুরুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করি, তখন সেখানে জৈব-লিঙ্গ নির্দেশ করাটাই মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাড়ায়। কিন্তু ‘মেয়েলি’ বা ‘পুরুষালি’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে জেন্ডার প্রপঞ্চকে যুক্ত করা হয় যেখানে নারী বা পুরুষের লিঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যকে ছাপিয়ে স্বভাব-আচরণগত ইত্যাদি বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। আর এ কারণে সেক্সকে জৈবলিঙ্গ এবং জেন্ডারকে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক লিঙ্গ বলে অনেকে অভিহিত করেন।

বস্তুত জৈব বৈশিষ্ট্যর বলয় অতিক্রম করে সাংস্কৃতিক বলয়ে অন্তর্ভুক্ত হবার বাসনার কারণেই মানব সমাজে রূপান্তরকামিতার অস্তিত্ব আছে বলে মনে করা হয়।

কৃত্রিম উপায়ে লিঙ্গপরিবর্তন – অস্ত্রোপচার

অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লিঙ্গপরিবর্তন বা সেক্স চেঞ্জ খুব জটিল প্লাস্টিক সার্জারী অপারেশন। এই অপারেশনে যারা নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন হ্যারি বেঞ্জামিন, স্টিনাক, আব্রাহাম, জন মানি প্রমুখ। রূপান্তরকামী এবং উভলিঙ্গ মানবদের চাহিদাকে মূল্য দিয়ে ডাক্তাররা সার্জারির মাধ্যমে সেক্সচেঞ্জ অপারেশন করে থাকেন। যেহেতু রূপান্তরকামীতাকে কোন অসুখ মনে করা হয় না, তাই ঔষধ প্রয়োগ করে এই মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বদলে ফেলা সম্ভব নয়। একমাত্র সেক্সচেঞ্জ অপারেশনের মধ্য দিয়েই অনেকে মানসিক পরিতৃপ্তি পেয়ে থাকেন। পুরুষ রূপান্তরকামী অর্থাৎ যারা পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হতে চায়, তাদের জন্য এক ধরনের অপারেশন, আর নারী রূপান্তরকামীদের জন্য ভিন্ন অপারেশন। মুলতঃ শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে চামড়া অ টিস্যু নিয়ে গ্রাফটিং এর মাধ্যমে যোনিপ্রদেশ গঠন করা হয়, হরমোন থেরাপির সাহায্যে স্তন গ্রন্থির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটানো হয়, সিলিকন টেস্টিকেলের সাহায্যে অন্ডকোষ তৈরি করা হয়, ইত্যাদি ।

ইরানে লিঙ্গপরিবর্তন

ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের আগে লিঙ্গপরিবর্তন প্রবণতা সরকার স্বীকার করেনি। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি ভাগে সরকার লিঙ্গপরিবর্তনকারীদের স্বীকার করে ও তাদের শল্যচিকিৎসার অনুমোদন দেয়। ২০০৮ সালের মধ্যে ইরান বিশ্বের অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি এ জাতীয় শল্যচিকিৎসা করে একমাত্র থাইল্যান্ডই শুধু তাদের চেয়ে এগিয়ে থাকে।যাদের সাহায্য প্রয়োজন তাদেরকে সরকার অর্ধেক টাকা দেয় শল্যচিকিসাৎর জন্য ও তা জন্ম সনদে লেখা থাকে। ১৯৬৩ সালে ইরানের আয়াতুল্লাহ রহোল্লাহ খোমেনী তার লেখা এক বইয়ে বলেন যে লিঙ্গপরিবর্তন ইসলামবিরোধী নয়। সে সময় আয়াতুল্লাহ ছিলেন যুগান্তকারী, শাহবিরোধী বিপ্লবী এবং তার এই ফতোয়া সে সময়ের রাজকীয় সরকার কোন আমলে নেয় নি ও তাদের এই বিষয়ে কোন নীতি ছিল না। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরানে নতুন ধর্মীয় সরকার আসে যারা লিঙ্গপরিবর্তনকে পুরুষ সমকামী ও স্ত্রী সমকামীদের কাতারে ফেলে এটা নিষিদ্ধ করে ও এর জন্য মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখে। লিঙ্গপরিবর্তনের স্বপক্ষে প্রথম প্রচারণা চালান ফেরেয়দুন নামের একজন পুরুষ যিনি মেয়ে হয়ে যান লিঙ্গপরিবর্তন করে মারইয়াম হাতুন মোল্কারা নাম ধারণ করে। বিপ্লবের আগে তিনি মেয়ে হয়ে যান কিন্তু তিনি শল্যচিকিৎসার কোন চেষ্টা করেননি।পরে তিনি ধর্মীয় অনুমোদন চান। ১৯৭৫ সালে থেকে তিনি আয়াতুল্লাহ কাছে বার বার চিঠি লিখতে থাকেন যিনি ঐ বিপ্লবের নেতা ছিলেন ও নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিপ্লবের পর তিনি চাকরীচ্যুত হন ও তাকে জোর করে হরমোন ইঞ্জেকশন দেয়া হতে থাকে। তিনি কারারুদ্ধও হন। পরে তিনি মুক্তিপান তার পরিচিত ব্যাক্তিদের মাধ্যমে ও লবিং চালাতে থাকেন নেতাদের কাছে।তিনি খোমেনীর সাথে দেখা করতে যান। তখন তার রক্ষীরে তাকে থামান ও মারতে থাকে। পরে আয়াতুল্লাহ তাকে এক চিঠির মাধ্যমে বিষয়টির বৈধতা দান করেন। এ ধরনের শল্যচিকিৎসার পক্ষে ফতোয়া হিসেবে চিঠিটিকে চিহ্নিত করা হয়। কিছু সংখ্যক ইরানিয় বলে থাকেন যে সমকামী ব্যাক্তি তাদের বৈধ জীবন কাটানোর জন্য এ ধরনের ব্যাপার ঘটায়।

উভলিঙ্গত্ব

উভলিঙ্গ মানবদের ইংরেজিতে অভিহিত করা হয় হার্মফ্রোডাইট বা ইন্টারসেক্স হিসেবে। উভলিঙ্গত্বকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয় – প্রকৃত উভলিঙ্গত্ব (true-hermaphrodite) এবং অপ্রকৃত উভলিঙ্গত্ব (pseudo-hermaphrodite)। প্রকৃত উভলিঙ্গ হচ্ছে যখন একই শরীরে স্ত্রী এবং পুরুষ যৌনাঙ্গের সহাবস্থান থাকে। তবে প্রকৃতিতে প্রকৃত উভলিঙ্গত্বের সংখ্যা খুবই কম। বেশী দেখা যায় অপ্রকৃত উভলিঙ্গত্ব। সাধারণতঃ ছয় ধরণের অপ্রকৃত উভলিঙ্গত্ব দৃশ্যমান – কনজেনিটাল এড্রেনাল হাইপারপ্লাসিয়া (CAH), এন্ড্রোজেন ইন্সেন্সিটিভিটি সিন্ড্রোম (AIS), গোনাডাল ডিসজেনেসিস, হাইপোস্পাডিয়াস, টার্নার সিন্ড্রোম (XO) এবং ক্লাইনেফেল্টার সিন্ড্রোম (XXY) । উভলিঙ্গত্বের বিভিন্ন প্রপঞ্চের উদ্ভব বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে।

হিজড়া

বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ এশিয়ার ইন্টারসেক্স এবং রূপান্তরকামী সম্প্রদায়কে প্রচলিতভাবে ‘হিজড়া’ নামে অভিহিত করা হয়। তবে, হিজড়া শব্দটি বাংলাদেশে খুব তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত হয় বলে কিছু লেখক সাম্প্রতিক কালে ‘উভলিঙ্গ মানব’ শব্দটি সামাজিকভাবে ব্যবহার করার প্রস্তাব করেছেন । অনেকে হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতির দাবী করেছেন। বাংলাদেশে যে সমস্ত হিজড়া বা উভলিঙ্গ মানবরা শারীরিকভাবে পুরুষ, কিন্তু মানসিকভাবে নারী স্বভাবের সে সমস্ত উভলিঙ্গ মানবদেরকে পল্লীতে ডাকা হয় ‘অকুয়া’ হিসবে। অন্য দিকে যে সমস্ত উভলিঙ্গ মানবরা শারীরিকভাবে নারী, কিন্তু মানসিকভাবে পুরুষ, তাদের বলা হয় ‘জেনানা’। এছাড়া সামাজিক প্রথার শিকার হওয়া মনুষ্যসৃষ্ট উভলিঙ্গ মানবদেরকে (এরা আসলে রূপান্তরকামী) বলা হয় ‘চিন্নি’ । বাংলাদেশে উভলিঙ্গ মানবদের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ বলে অনুমিত হয়।

রূপান্তরকামিতা ছাড়াও সমান্তরাল যৌনপ্রবৃত্তির আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হচ্ছে সমকামিতা এবং উভকামিতা ।

One thought on “রূপান্তরকামিতা

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s