বিবর্ণ বসন্ত – লেখক: হোসেন মাহমুদ

-কি চাস?
-তোর মনটাকে চাই।
-গাধা, আমার মন চাস তো শরীরের উপর চড়ে আছিস কোন দুঃখে?
-সরি, মিসটেক হয়ে গেছে। তোর মন শরীর দুইটাই চাই।

সানী লাল আন্ডার ওয়্যার পরে অন্ধকারে আমার ঘরে কি করছে?
আর এই গভীর কালো অন্ধকারে আমি তাকে স্পষ্ট দেখছি কি ভাবে? চিন্তার বিষয়! এত দিন পর তার আমার শরীর ভক্ষণে সখ হল কেন? দূর ভালো লাগছে না। গভীর রাত, কোথায় একটু ঘুমাবো, তার উপর একটা উটকো ঝামেলা এসে জুটেছে। ইচ্ছা করছে চেঁচিয়ে নয় গলা ফাটিয়ে একটা চীৎকার দেই।

চিৎকার দেয়ার আগেই ঘুমটা ছুটে গেল। বিছানার পাশে ঢেকে রাখা পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঢক ঢক করে পানিটা শেষ করলাম। এই শীতের রাতে ও আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বালিশের নীচ থেকে মোবাইল বের করে সময় দেখলাম ভোর ৪ টা বেজে কুড়ি মিনিট। বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাম। এই ভাবে চলতে পারে না। সানীকে খুঁজে বের করতেই হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের ধরে ছুটে চলেছে বাস। রাস্তা প্রায় জনশূন্য বললেই চলে। ড্রাইভার মনের আনন্দে দিলখোস ভঙ্গীতে গাড়ি টানছে। রাস্তাটা এখানে খানিকটা একে বেঁকে। উল্টোদিক থেকে আরেকটা বাস বা ট্রাক আসলে ভালোমন্দ যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। ও দিকে দৃষ্টি পাত না করে আমার চোখ বাইরের সবুজ গাছগুলোর কালচে ছায়ায় লেপটে আছে। একটা ছেলে গরু নিয়ে যাচ্ছে দূরের গাঁয়ের মাঠ দিয়ে। ছেলেটার গায়ে এই শীতেও একটা গামছা মাত্র জড়ানো। ছেলেটা, তার গামছা আর গরুগুলোর ক্ষুদে ছায়াও আমার চোখ এড়ায়নি। এ মুখো হয়েছি বহু দিন হয়েছে। তখন আমি বালক আর যুবক বয়সের সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছিলাম।

আমার সোনালী শৈশবটা কাটে রেণু খালার শ্বশুর বাড়ীতে। অপয়া শব্দটার যথাযথ প্রয়োগ আমার জীবনে বহু বার করেছে চার পাশের মানুষ গুলো। জন্মানোর বছর খানিক পর মাকে আর বছর ঘুরন্তই না দিতে বাবাকে খেয়েছি বলে। বুঝ হওয়ার পর থেকে রেণু খালাকেই মা বলে জেনে এসেছি। সেই মায়ের ছায়া এত বিশাল ছিল যে বাবা মা শূন্যতার আঁচড় কখনো কেটেছে বলে মনে পড়ছে না। তবে হা, শেষের এক যুগের কথা আলাদা। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুকের গভীর থেকে। শামুকের খোলে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস জানালা গলে গলে যাত্রা করে অনন্তের দিকে। রাস্তার ধার ঘেঁষে বেড়ে উঠা সবুজ গাছ গুলীর ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে এক ঝলক রৌদ্র এসে মুখ আর চোখের উপর ঠেকছে। পছন্দের কয়েকটা দৃশ্যর মাঝে এইটা একটা। ভালোলাগার বহিঃপ্রকাশের সাথে চোখ দুখানি আপ্লুত হয়ে নুয়ে এলো। আমার চোখে আবছা আলোয় ভেসে উঠতে লাগলো শৈশবের রঙিন কাপড়ে মোড়ানো দিন গুলো।

গ্রামের কাক ডাকা দুপুর, মাথার উপর রৌদ্র ঝলমলে বিশাল কালচে নীল আকাশ। উদোম গায়ে ছুটে বেড়াচ্ছে দুইজন কিশোর। কখনো সবুজে ঢাকা মাঠে, কখনো নদীর কিনারে ঝিনুক কুড়াতে কুড়াতে ক্লান্ত দুখানি ছিপছিপে শরীর। একটা ঘাস ফড়িং হস্তগত করার লোভে ম্যারাথন দৌড়। ঘামে ভিজা শরীর নিয়ে বন্দী জ্বলের পুকুরে ঝাঁপ। দুপুর ঘড়িয়ে ঘড়ির কাটা বিকেল ছুঁই ছুঁই পুকুর পাড়ে বাঁশের কঞ্চি হাতে মা এসে দাঁড়ায়। ঝাঁঝালো কণ্ঠে চীৎকার দিচ্ছেন ঠিকই কিন্তু কণ্ঠে সফটনেসের আবেশ। আমি আর রানার চোখে ভয়ের বলাই নেই বললেই চলে। মায়ের ঐ শাসন, মাইর দিবো বলে ধমকি সেতো নিত্য দিনের হাতিয়ার। মাঝে সাঁজে নারিকেল পাতার শলা নিয়ে তেড়ে আসতো আমাদের দিকে। রানা তো এক দৌড়েই লংকা পার, আর আমি হাত সমেত মাকে সাপের মত পেঁচিয়ে রাখতাম শক্ত করে। একটু পর মায়ের ঠোঁট ফসকে এক চিলতে হাঁসি উপচে পড়ত। ব্যাস রাগ গরম তেল থেকে পানি।

সানী সম্পর্কে আমার খালাতো ভাই হলে ও ভাই কিংবা বন্ধু অথবা অভিমানে প্রকাশ্য শত্রু হিসাবেই দেখতাম। বয়সের মাপকাঠির হিসাব কষতে গেলে বছর খানিকের এদিক ওদিক হবে। কাঁঠালের আঠার মত একজন আরেকজনের পিছনে লেগে থাকলেও চুম্বকের মত আকর্ষণ করতো দুজনাতেই। বিশেষ করে শীতের রাতে দুজনের দুইটা মাথা যখন একই বালিশের উপর মালিকানা ফোলাত। সানীর দাদী পান চিবুনো ছাড়া যদি অন্য কিছু জানত তা হল বানিয়ে বানিয়ে ভূতের গল্প বলা। অবশ্য গল্প বানানোর মত বুড়ীর জ্ঞান বিশেষ ছিল না ঐ এনিয়ে বিনিয়ে একই গল্পের মাথায় কখনো প্যান্টে আবার পায়ে দিতেন ফতুয়া পরিয়ে। ওতেই সানীর কর্ম সারা, বুড়ির ঐ বানানো ভূতের জন্য শীতের রাতে ও আমার ঘুমের ১২ টা বাজাত। ভুতে নয় সানীর অত্যাচারে আরামের ঘুম হারাম করে তাকে পাহারা দেয়ার জন্য দরজা খুলে বাহিরে যেতে হতে হত আমায়। তার প্রাকৃতিক কর্ম সারা পর্যন্ত আমাকে দারোয়ান হয়ে ভূতের হাত থেকে সানীকে বাঁচাতে হত। বুড়ির বানানো গল্পে ভূতের আমদানি বন্ধ করতে পাড়ার বন্ধুদের ডেকে ২ টাকার লাঠি বিস্কুট দিয়ে মিলাদ পড়িয়ে ছিলাম বুড়ির ইহলোক ত্যাগের জন্য। কাজের কাজ যা হল আমার এত গুলো টাকা মানে দুই টাকা জ্বলে ফেললাম। বুড়ি তো মরলই না শেষ কালে যেতে যেতে বদনা ভূতের গল্প বিনে পয়সায় গেঁথে দিয়ে গেলেন সানীর মাথায়। দুনিয়ার এত কিছু থাকতে ঐ বদনা ভূত নাকি শুধু বদনা ওলাদের ঘাড় মটকে দেয়। সেই ভয়ে সানী রাতের বেলায় বদনার ত্রিসীমানায় ও যেত না। অবশ্য বুড়ির সেই মনগড়া ভূতে আমার মন আর শরীর খোরাক ও মিটিয়েছে অনেক দিন, মাঝ রাতে সানী যখন ভূতের ভয়ে জড়সড় হয়ে ঘাপটি মেরে ভালুক ছানার মত আমার বুকের মাঝে চুপ করে লুকীয়ে থাকত তখন, ঐ ১২ বছর বয়সে আমার ভীতরে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হত। অন্যরকম এক ভালোলাগা, সাথে শরীর কামনার আমন্ত্রণ পত্র না হলে ও হৃদয়ের ভাষায় তীব্র টেলিপ্যাথিক যোগাযোগে মন দেয়া নেয়ার নিমন্ত্রণ ঠকই পেতাম।

বয়সের নাটাই ১৪ তে টান পড়ায় হালকা কালচে গোঁপ আর দাঁড়ি আমার মুখ জুড়ে বিরাজমান। বুঝতে পারি প্রকৃতি আমাকে বালক থেকে যুবকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সেই নতুন প্রাপ্ত আগমনী যৌবনের পুরপুরি কার্যকরীতার প্রভাব বিস্তর করে সানীকে জুড়ে। একদিকে দাদীর মনগড়া ভূত, অন্যদিকে আমার সদ্য প্রাপ্ত নবীন যৌবন দুটাই হ্যারিকেন মহসিনের মত তেড়ে আসে সানীর উপরে। কত রাত আমার বেহায়া মুখটা তার বুকের উপরে থাকা বাদামী বোতামর উপরে আবিষ্কার করেছি মনে নেই। সানীর চুপ করে থাকা ঘুমের ভান মন সম্মতি হিসাবে তার শরীর ভ্রমণের অগ্রিম অনুমতির প্রশ্রয় দেয় আমাকে। অবশ্য সেই যৌনতা কিংবা ক্ষুদে ভালোবাসার পরিপূর্ণতার শুভ সূচনা তার দিক থেকেই শুরু হয়। শীতের রাতে লেপের নীচে তার নরম মকমলের মত হাতের গরম স্পর্শে আমার কাম বাসনার দ্বার উন্মুক্ত হয় প্রথম। সেই থেকে শুরু, বয়স চৌদ্দর গোঁড়া থেকে সাড়ে পনের অবধি সময় আর সুযোগ পেলেই সেই কামলীলায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তাম আমরা দুজন। বেশীর ভাগ সমকামীদের প্রারম্ভিক প্রত্যাশা মন দেয়া নেয়ার ফলশ্রুতি ভালোবাসা, আমাদের বেলায় তার উল্টো। গরম শরীর, তৃষ্ণার্ত চোখ, বিন্দু বিন্দু ঘাম এই সব উপকরণ এক সাথে মিলে সানী আর আমার মনের মাঝে আড়াআড়ি ভাবে বিঁধে যায় ভালোবাসার বীজ। সেই বীজের অংকুরোদগম খুব তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ে সানীর মাঝে। তখন আমার বেলায় ঐ রথ দেখা কলা বেচার মতন। সানী অনেকটাই আমার প্রভাবে প্রভাবিত তখন। তাকে আমার ভালো লাগত ঠিকই, কিন্তু সেইটা যে সমপ্রেম কিংবা সাত রাজার ধন ভালোবাসা, বুঝতে আমার কালে কালে অনেক বেলা গড়িয়ে গেছে।

এস, এস, সি, পরীক্ষার মাত্র সতের দিন বাকী। দুজনে উপুড় হয়ে বইয়ের পাতায় ডুবে রইলাম। বাড়ীর সবাই সানীর ফুফাতো ভাইয়ের বিয়েতে গেছে, ইচ্ছা থাকার স্বত্বেও পরীক্ষার দোহাই দিয়ে আমাদের যাওয়ার উপর ১৪৪ ধারা জারী। তাই সানী, আমি আর তাদের বাড়ীর কাজের ছেলে কাম কেয়ার টেকার মতলব, ফাঁকা বাড়ীতেই পড়ে রইলাম। সানীর দারুণ অংক ভীতি আছে। আর আমার তার উলটো অংক প্রিতি। দুপুরে খেয়ে অংক কষতে বসলাম দুজনে। বীজগণিতের একটা সমাধান মিলাতে সানীর চুল চিড়ার মত অবস্থা। তাকে সাহায্য করার জন্য তার খাতায় চোখ রাখলাম। দুজনের শরীর ঘেঁষা ঘেঁষিতে তাপের সূক্ষ্ম ছাপ অনুভব করলাম। সেইদিনের সেই তাপ আমার সারা জীবন পরিতাপের কারণ। বাড়ীতে কেউ নেই তাই দরজা লাগানোর প্রয়োজনবোধ করলাম না। ঐ চেয়ারে বসেই শুরু করলাম আদিম খেলা। দুজনের কণ্ঠে কাম বাসনার মিষ্টি আওয়াজ। সমস্যার তো কিছু নেই বাড়ীটা তো জনশূন্য। মতলব তো সারা দিন ঐ করিম শেখের চায়ের দোকানে চা আর আকিজ বিড়িতে ডুবে আছে। আমারা যখন কাম বাসনার চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছি, তখন কে যেন হঠাৎ খিল না দেয়া দরজায় হাত দিয়ে উন্মুক্ত করে দেয় সবকিছু। আমি আর সানী দুজনে ছিটকে পড়লাম দুদিকে।

আমাদের শেষ রক্ষা হয়নি। মতলব সারা গ্রামে কান পড়া দিয়ে ফেলেছে। আমরা দুজনে নাকি হিজড়া। লজ্জায় আমরা বাড়ী থেকে বের হতে পারিনি দুদিনে। কিন্তু আর একদিন পরই মা আর বাড়ীর সবাই ফিরবেন। সবার মুখে নিশ্চয় মা সবকিছু শুনবেন, আমি মাকে এই চোখ পারবো না। তাই ঐ দিন রাতেই সানীকে কিছু না বলে স্কুল ব্যাগে প্রয়োজনীয় জামা কাপড় গুছিয়ে হাটা ধরলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। আমার পকেটে তখন শ খানিক টাকা। ভাবলাম যা হবার তাই হবে। ঐ দিন স্বার্থপরের মত শুধু নিজের কথাই চিন্তা করলাম। একবার ও সানীর কথা ভাবলাম না।

ঢাকায় এসে উঠলাম দূরসম্পর্কের এক ফুফুর বাড়ী। তার বাড়ীতে আমার জন্য একটা স্থায়ী আসন পেয়ে গেলাম। হতে পারে ফুফুর নিজের কোন সন্তান ছিল না বলে, বাবা মা হারা আমি কে তার সন্তান বানাতে চেয়েছিলেন। যাই হক তার দুবছর পর ফুফুর বাসা থেকেই এস, এস, সি, টা শেষ করলাম। তার পর কলেজ, ইউনিভার্সিটি। নূতন পরিবার পেলাম সাথে ফুফুর মত মা। সব কিছুই ছিল তারপর ও আমি পিছনের কোন পুরাণ সুতোর টান অনুভব করতাম। আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম আমার ছোটবেলার খেলার সাথী, খালাত ভাই সানী আমার ভিতরের অনেকটা যায়গা তার দখলে নিয়ে গেছে। হয়তো ঐ উড়তি বয়সে প্রথম ভালোবাসা কিংবা প্রথম যৌনতার ছোঁয়া তার কাছ থেকে পেয়েছি বলে। দিন যায় মাস ঘুরে বছর আসে সানীর প্রতি আমার ভালোবাসা গভীর থেকে আরও তীব্রতর রূপ নিতে থাকে। গেল বছর ফুফু মারা যায় অপয়া শব্দটা আরও একবার মনে পড়ে যায়। আমার মাথার উপরের কোন ছায়াই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠে না। একজন হয়তো সেই ছায়া হয়ে থাকত, কিন্তু তাকে তো অনেক গুলো বছর আগেই খুইয়ে এসেছি।

এখানকার সবকিছু আমার পরিচিত শুধু আমিই এদের অপরিচিত। অবশই এদের দোষ দিয়ে কি হবে ১২ বছর পর একটা মানুষের দেহের অনেক পরিবর্তন ঘটে। তার উপর আমি এখন পরিপূর্ণ যুবক মুখে ফ্রেঞ্ছ কাট দাঁড়ি। মনে হচ্ছে সানীর নিজেও চিনতে কষ্ট হয়ে যাবে। আমার শৈশবের সেই বাগান বাড়ী, পুকুর ঘাট ফেলে পৌঁছে গেলাম সানীদের বাড়ীর সামনে। কিছুটা লজ্জা, অপরাধ বোধ মিশ্রিত চোখের চাউনি দিয়ে তাকিয়ে আছি বাড়ীটার দিকে। ভাবছি এতগুলো বছর পর সানী কি আগের মত আমাকে কাছে টেনে নিবে? আর যদি সানি ও আমাকে এখনো আমার মত ভালোবাসে তাহলে তাকে নিয়ে উড়াল দিবো কোন এক অচেনা রাজ্যে। তাকে নিয়ে বানাবো আমার নূতন করে পুরাণ পৃথিবী।

বাড়ীর ভিতরের দরজায় দাঁড়ীয়ে নিম্ন সুরে ডাক দিলাম সানী, সানী।
একটু পর সাত আট বছরের এক ছেলে এসে বলল,
-বাপজান বাজারে গেছে। আফনি কে?

সেই ছেলের দিকে তাকিয়ে আর কথা শুনে বুঝতে পারলাম। আমার আশায় গুঁড়ে বালি। শতকরা হিসাবে বাংলাদেশের ৯৮ ভাগ সমপ্রেমিদের বেলায় যা হয় সানীর ও তাই হয়েছে। বিয়ে করে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে তার বাড় বাড়ন্ত সংসার। এত গুলো বছর মনে মনে আমি যে ভালোবাসার তাজমহল বানিয়েছে, ঐ ছেলের কথায় খেলনা তাজমহলের মত এক ঝটকা হাওয়া এসে ভেঙ্গে দিয়ে গেল। সানীকে দোষারোপ করে কি হবে, যে পরিবেশ আর সমাজের বেষ্টনীতে আবদ্ধ আমরা তাতে ঐ বিয়েটাই হল সকল সমকামীদের শেষ আশ্রয় কিংবা নিজের ভিতরের আমিটাকে সাদা কাফন পরানোর মূলমন্ত্র। সানীর ছেলের মাথায় হার রেখে আদর দিয়ে পথের দিকে পা বাড়াবো এমন সময় দরজার আড়াল থেকে নারী কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
-হেয় একটু পর অ্যাইসা পরবো, আফনি কাছারি ঘরে গিয়া বসেন।
-না আসলে এ দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম সানী আছে কিনা দেখে যাই। আমি তার পরিচিত। (কথাটা বলতে গিয়ে কণ্ঠটা কেঁপে উঠল)আচ্ছা সানীর মা কি বাড়িতে আছেন?
-ওমা আফনি দেহী কোন খবর রাখেন না। হেয় তো মইরা গেছে অনেক বছর আগে।

তার কথা শুনে মনখারাপের মাঝেও আরেক ছটাক মন খারাপের হাওয়া বয়ে গেল। মায়ের মত সেই খালা নেই সানীর ছিল, সেও এখন এক নারীর সংসারের কর্তা। আমার ঝুলিতে রইল মরুভূমির শুঁকনো বালির প্রান্তর। মা ছেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সদর দরজায় দিকে পা বাড়ালাম, দেখলাম বাজার হাতে মধ্য বয়সের এক যুবক হন হন করে বাড়ীতে ঢুকছে। আমি ওখানটায় স্থবির হয়ে দাঁড়ীয়ে রইলাম। চিনতে একটু অসুবিধা হয়নি, এই সেই সানী। তার চকচকে ফর্সা গায়ের রঙ এখন মাঠে খেটে খাওয়া রাখালদের মত কালচে হয়ে গেছে। নাকের নীচে গোঁপ, মাথাটা সামনের দিকে ঝুঁকানো। বয়স তো তেমন কিছু হয়নি। তাহলে সানীকে এমন বয়স্ক লাগছে কেন? ইচ্ছা করছে তার কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরি তাকে। কানের কাছে মুখ নিয়ে বলি। চিনতে পারছিস, আমি তোর সেই মামুন।

সানি আমার দিকে তাকিয়ে আছে, কিছু বলতে গিয়ে ও থেমে গেছে। একটু সময় নিয়ে বলে,
-আফনারে তো চিনতে পারলাম না।
আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম তার বউ আর বাচ্চাটা আসে পাশে নেই। সুতরাং অপরিচিতের ভান করাটাই শ্রেয়। কি লাভ তার সাজানো সংসারে অশান্তির আগুন জালীয়ে। খুব শান্ত ভাবে মুখ খুললাম,
-এ পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম পানির পিপাসা পেয়েছিল। তাই আপনার বাচ্চার হাতের পানি দিয়ে তৃষ্ণা মেটালাম।
আর কিছু না বলেই আমি সানীকে ধন্যবাদ দিয়ে পা বাড়ালাম। যেতে যেতে আরেকবার সানীর দিকে তাকালাম। আচ্ছা সত্যি কি সানী আমাকে চিনতে পারেনি? কিন্তু তার টলমলে চোখের ভাষা আমাকে পরিষ্কার ভাবে জানান দিল, সে আমাকে চিনতে পেরেছে। আমার চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলাম না। দু ফোঁটা অশ্রু মুখ বেয়ে মাটিতে পড়ল।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সানীদের বাড়ীর বাম পাশটা ধরে সামনের দিকে আগালেই করিম শেখের চায়ের দোকান। ইচ্ছা করছে শৈশবের মত সানীর হাত ধরে দোকানের মাচায় পা তুলে, পিরিচে চা ঢেলে আওয়াজ করে খাই। দুনিয়া কত এগিয়ে গেছে কিন্তু করিম শেখের চায়ের দোকানটা আগের মতই জীর্ণ শীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। করিম শেখ এখন বুড়ো হয়ে গেছে, গলার সাথে সুতো দিয়ে বাঁধা মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। একটা চায়ের অর্ডার দিলাম। শীতের রাত বলে দোকানে মানুষ তেমন একটা নাই। করিম শেখ কে নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম, আমাকে চিনেছ চাঁচা? চশমাটা ফাঁক করে আমার চেহারার দিকে ভালো করে তাকিয়ে বলে,
-চিনবো না কেন। তুমি মামুন নাহ?
বুড়োর স্মৃতিশক্তি দেখে অবাক হলাম। নামটাও মনে রেখেছে। আবার জিজ্ঞাস করল,
-তা এত বছর পর কার কাছে আইলা?
-সানীদের বাড়ীতে গেলাম। ভাবলাম খালা আর সানীকে দেখে যাই। এসে শুনলাম খালা তো বেঁচে নেই, সানী বউ বাচ্চার সংসার দেখে এইতো ফিরলাম।
করিম শেখ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
-মাইনে কি? সানী কোত্থেকে সংসার করবো। হেয় তো তার মায়ের আগেই মইরা গেছে।
বুড়ো করিম শেখের রসিকতা বিরক্ত লাগছে। বললাম চাঁচা বুড়ো হয়েছ, এখনো রসিকতা যায়নি। করিম শেখ মুখে বিরক্তির ছাপ ফেলে বলে,
-আমি মস্করা করমু কেন? তোমার পাশে বসা লোকটারে জিজ্ঞাস কর।
পাশের লোকটাও একই কথা বলল। সানী এবং তার পরিবারের কেউই নাকি বেঁচে নেই। একজন একজন করে গোটা পরিবার নাকি সাবাড় হয়ে গেছে। গ্রামের সবাই বলে ঐ পরিবারে নাকি ভূতের আছর পড়েছিল। তাই গুষ্টি সহ সব বিদায়। আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। চায়ের কাপ টা রেখে দৌড়াতে দৌড়াতে সানীদের বাড়ীর দিকে গেলাম। এইবার আমার অবাক হবার পালা। একটু আগে যে বাড়িটায় এসেছিলাম এইটা সেই বাড়ী মনেই হচ্ছে না। আগের পরিচিত দুটো ঘর এখনো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে পুরোপুরি শ্মশান কিংবা গোরস্তান। বাড়ীর উঠানে মানুষের পা পড়েনি অনেক বছর। তাহলে একটু আগে আমি কি দেখলাম?
আমার শরীর ঘামছে। আমি সব কিছু অন্ধকার দেখছি। মাথাটা চার দিকে ঘুরছে। বুঝতে পারছি আমি জ্ঞান হারাচ্ছি।
ডাঃ সামাদ আমার মাথায় টোকা দিচ্ছেন আর নাম ধরে ডাকছেন। আমি চোখ খুললাম। সব কিছু বুঝতে কিছুটা সময় নিলাম। আমি তো গত দুমাস ধরে হসপিটালের বিছানায় পড়ে আছি। তাহলে একটু আগে সানী, তার গ্রামের বাড়ী, সব কিছুই আমার স্বপ্ন? বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সবকিছু এখনো ঘোর এর মত লাগছে। ডাঃ বললেন, কাল নাকি আমার ঘুম আসছিল না। তাই নার্স ঘুমের কড়া ওষুধ দিয়েছিল।

যে নার্সটা এত দিন আমার সেবা করেছে সে আমার দিকে তাকিয়ে অঝরে মায়াকান্নায় চোখ ভাসিয়েছে কয়েকবার। সে জানে আমি মরার পর সোজা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মর্গে যাবো বেওয়ারিশ লাশ হয়ে। দুনিয়াটা বড়ই অদ্ভুত। প্রকৃতি অপ্রয়োজনে আমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছে। সাথে বেঁধে দিয়েছে সমকামীর সিলমোহর। তাই সারা জীবন অনেকের দুয়ারে ভালোবাসার জুড়ী নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, কিন্তু ভালোবাসা তো দূরে থাক, শেষ বয়সে মুখে পানি দেয়ার জন্য ও কাউকে পেলাম না। জীবনে অনেকবার মনে হয়েছে সব সমকামীরা সারা জীবন একাই থাকে, আর শেষ বয়সে আরও একা। আজ শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে, শুধু একটা জিনিষ জানতে ইচ্ছা করছে খুব। আচ্ছা সানী কি সত্যি মারা গেছে? সে খোঁজ নেবার সময় বিধাতা হয়তো আমাকে দেয়নি। জীবনের অনেক বসন্ত পার করে এসেছি। এই সমকামী জীবনের কোন বসন্তকেই রংধনুর সাত রঙে রাঙাতে পারিনি। সমকামী জীবনের প্রতিটা বসন্তই যেন এক একটি বিবর্ণ বসন্ত।

6 thoughts on “বিবর্ণ বসন্ত – লেখক: হোসেন মাহমুদ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s