পিচ ঢালা পথ – পিয়াল ইশতিয়াক প্রাচুর্য

-কারো গৃহপালিত স্বামী হবার জন্যই তোর জন্ম।
-চেঁচালে চোখ গালিয়ে দেবো!!!

সিডর আইলা থেকেও শক্তিশালী ঝগড়া হল। এমন ঝগড়ার পর দুমিনিট না যেতেই চোখ ভারী হয়ে আসছে। অবাক না হয়েই লক্ষ করলাম নিজের অজান্তেই হাতের বুড়ো আঙুলটা সেলফোনের সবুজ বাটনটায় দুবার প্রেস করলো। আমার কানের সাথে ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরা। হয়তোবা ওর কানের সাথেও। কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে ওকে শুনলাম, দুজনেই কাঁদছি। কোন এক অজানা কিন্তু পরিচিত কারণে। ঘড়ির কাটা রাত তিনটার ঘরে। কিছুক্ষণ কথার পর ঘুমাতে গেলাম।

আমি দীপ। আর এতক্ষণ কথা বলছিলাম অনিকের সাথে। গরম পীরের নামে কসম কেটে দুজনই অনেকবার বলেছি, আর কক্ষনো ঝগড়া টগড়া করবো না। কিন্তু ঝগড়াটা যে এখন ভালোবাসারই অংশ হয়ে গেছে। কয়েকবছর আগে এসএসসি পরীক্ষার শেষে আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে ঘোরাঘুরি করে প্রায় ১ মাস পর বাড়িতে ফিরলাম। বিকেলে আম্মু বললো, পাশের বাসার স্বাধীন কাকুরা চলে গেছেন। ওদের পরিবর্তে ভাড়াটিয়া হিসেবে ফজলু সাহেব এসেছেন। একটা ছেলে আছে ওনার, যে কিনা তোর বয়সীই, ওর সাথে খেলাধুলো সহ গল্প স্বল্প করতে পারবি। মনে মনে আমি ভাবলাম, মতি, ফজলু, বল্টু, এসব খ্যাত মার্কা(যদিও খ্যাত শব্দের অর্থটা জানা নেই আমার) নাম অতি কুত্সিিত, হাবা গোবা, কাজের ছেলেদের হয়। না জানি ফজলি সাহেবের ছেলের নাম ল্যাংড়া না হয়ে বসে! এসব শুদ্ধকথা(?) ভেবে কল্পনায় ফজলি সাহেবের ছেলের চেহারা বানিয়ে ফেললাম। অতি কুত্সিহত, বিকট দর্শন, কালো কটকটে আর ইয়া মোটা ভেটকু।
ধ্যাত্‍.. .. .. ..

পরদিন সকালে ফজলু সাহেবের ব্যালকনিতে একটা ছেলেকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখলাম। ছেলেটার বয়স মেরে কেটে সতের টতের হবে। ব্যালকনিতে দাঁড়ানো ছেলেটা এতটাই সুন্দর ছিল যে, আমি দেখে “ত” এর পরে “থ” হয়ে গেলাম! দেখামাত্রই তীব্র ভালোলাগা কাজ করছিলো। শুনেছি কোন ছেলে যখন বুঝতে পার যে কোন মেয়ে তার প্রেমে পড়েছে, তখন সে প্রচণ্ড খুশিতে বিস্ফোরিত হয়। মেয়েটার চেহারা কুত্সিকত নাকি সুন্দর এটা তার কাছে অতটা Important বিষয় না। কিন্তু আমি প্রচণ্ড খুশিতে বিস্ফোরিত হব, যদি কিনা এই ছেলেটা আমাকে.. ..

ঐ সময়টা পর্যন্ত লাস্যময়ী সুন্দরী থেকে, ৩ মণি মুটকি, অনেকেই তাদের ভালোবাসার কথা জানান দিয়েছিলো আমায়, কিন্তু মেয়ে গুলোর একটাকেও ভালো লাগেনি আমার। ভালো না লাগার কারণটাও এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ তোমরা(!) বিকেলে ছেলেটার সাথে স্বাভাবিক ভাবেই কথা হল। ওর নামটা বললো, আর এটাও বলল ওর মা নেই। বাবা ছেলের ছোট্ট সংসার, ভালোবাসা মাপার যন্ত্র থাকলে সর্ব স্বার্থহীন মায়ের নামটাই প্রথমে আসতো। আর অনিকের কাছে সেই অতি মূল্যবান মায়ের স্নেহই ছিল না। ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। একেই সমবয়সী, তার উপর অনিকের প্রতি গভীর Attraction কাজ করতো আমার। নিজের আরেকটা ছেলের মতোই আম্মু অনিককে ভালোবাসতো। ওর আর আমার বাড়ি যেহেতু একদমই পাশাপাশি ছিল, তাই সেই সময়টায় অল্প সময়েই প্রচুর ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম। কথায় পিঠে কথায় চারপাশটা গরম করে রাখতাম আমরা। বিকেলে ছোটকাকুর বাইকে করে ঘুরতে টুরতে বেরহতাম দুজনে। অনিক পাশে থাকলে খেলাধুলোয় মন বসতো না। বরং বিভিন্ন টপিক নিয়ে ওর সাথে গল্প কিংবা ঝগড়া করতে ভালো লাগতো।

সময়ের সাথে আমার attraction আস্তে আস্তে Love এর দিকে দৌড়চ্ছিল, হয়তোবা অনিকের ও (!)ইচ্ছে করছিলো দৌড়ে গিয়ে ওকে বলি,
“শোন হে রাজকুমার, ভালবাসি যে শুধু তোমায় ই”
ভালোবেসে পরতে পরতে অনিককে মিস করছিলাম। যে করেই হোক অনিককে এটা বলতে হবে। পতন যখন অবশ্যম্ভাবী তখন ঝাপ দেয়াই উত্তম। একদিন দুপুরে খেয়ে টেয়ে ভাতঘুম দিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি ৪৭টা মেসেজ আর ১৮টা মিসকল, সবগুলোই অনিকের, নিজের হাত কামড়ে খেতে ইচ্ছে করছিলো, তখনই ফোন দিলাম। সাথে সাথে অনিক ফোন রিসিভ করায় আমার স্বস্তি আসলো, স্বাভাবিক কথা বার্তার একপর্যায়ে অনিক বললো,
-কাউকে ভালোবাসো?
-হুম, বাসি।
-কাকে?
-তুমি জানো সে কে।
-সে ও যে তোমায় ভালোবাসে এটা জানো?
-না, মাত্র জানলাম।
-ভালো করেছ।

ফোন টা রাখার পর প্রচণ্ড আনন্দে চোখ ভিজে আসছিলো। দেশের সব মুরগি দিনে দুটো করে ডিম পাড়লেও এত খুশি হতাম না!

পরদিন দুপুরে খাবার টেবিলে বসে অস্থির লাগছিলো। টেবিলে শুধুই অতিরিক্ত তেল মশলা যুক্ত খাবার। কিন্তু আমার সে কারণে অস্থির লাগছিলো না। তেল মশলার যুক্ত ভারী খাবার মোটামুটি খেতে পারি আমি। আমার অস্থির লাগছিলো কারণ বিকেলে আমাদের একসাথে ঘুরতে বেরোবার কথা। কিন্তু সদ্য প্রেমের কথা জানান দেয়ায় দুজনের মধ্যেই নতুন বৌয়ের মত লজ্জা লজ্জা ভাব কাজ করছিলো। বিকেলে দুজনে রূপসা ব্রিজে ঘুরতে গেলাম। আমার উচ্চতা ভীতি খুব বেশী। প্রচণ্ড শক্ত করে ব্রিজের রেলিং ধরে আছি। অনিক তাকিয়ে দেখে হাসল। হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে আমার হাতটা শক্ত করে ধরল। কিছুটা অবাক হয়ে লক্ষ করলাম এতদিনের তীব্র উচ্চতা ভীতি আমার আস্তে আস্তে কমে আসছে।
-উঁচু জায়গার প্রতি তোমার অ্যালার্জি আছে জানতাম, কিন্তু এতটা নার্ভাস হয়ে পড়বে তা বুঝতে পারিনি।
-যখন আমার হাতটা তুমি শক্ত করে ধরলে, তখন থেকে আর নার্ভাস লাগছে না।
-আমার ছোঁয়া তোমায় সাহস দেবে, এটা তীব্র ভাবে চাচ্ছিলাম আমি।
-থ্যাংয়ু।
-কেন?
-আমায় ভালোবেসে পাশে থাকার জন্য।
-দীপ, তুমি কি জানো আমরা দেশের উচ্চতম ব্রিজের উপর দাড়িয়ে আছি।
-হুম।
ওর কথায় সামনের দিকটায় আরও ভালো ভাবে তাকালাম। ভীষণ ভালো লাগছিলো অনিকের হাতটা ধরে রূপসা ব্রিজ থেকে সবুজে ভরা থুলনা শহরটা দেখতে, নিচ দিয়ে নৌবাহিনীর জাহাজ যাচ্ছে, সন্ধ্যা নামলো। আলো আধারি পরিবেশে ওর আঙুল ধরে হাঁটছি তো হাঁটছি ই.. ভালোবাসা বুকের মধ্যে তীব্র একটা যন্ত্রণা তৈরি করে, কিন্তু তার মতো মধুর যন্ত্রণা দ্বিতীয়টি নেই।

সময়ের সাথে সাথে পদ্মা, মেঘনায় অনেক জল গড়াল। কিন্তু প্রতিনিয়ত দুজন দুজনের প্রতি আরও আকৃষ্ট হচ্ছি। ভালোলাগা, ভালোবাসা, কাছে আসা একই সুতোয় ঘুরপাক খাচ্ছে। ফজলু আঙ্কেল জরুরী কাজে ঢাকা যাওয়ায় সারা সময়ই অনিকের সাথে থাকলাম। দুপুর বেলা ছাদে দুজনেই দাড়িয়ে আছি। হুট করে বৃষ্টি নামল। হয়তোবা বৃষ্টিও বুঝেছিল এখন আধিভৌতিক রোমান্স টোমান্সের দরকার। কারণ প্রকৃতি তো তার মতই চলতে ভালোবাসে। কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজলে অনিকের ঠাণ্ডা লাগার বাতিক আছে। ও তাই ঝট পট সরে গেল, ওদিকে আমি ছাদের মাঝখানটায় দাড়িয়েই আছি। টুপ টাপ, ঝম ঝম বৃষ্টি আমার টি শার্ট, আমার থ্রি কোয়ার্টার, গায়ের সাথে লেপটে দিতে লাগলো। অনিক আমায় ভিজতে মানা করছিলো। দু মিনিট যাবার পর কিছুটা অবাক করে দিয়ে ও আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। দুজনই দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে, চোখ গুলো লাল হয়ে আসছে। কোন এক আদিম কিন্তু সদ্য আকর্ষণে দুজন পরস্পরকে বাহুডোরে জড়ালাম। ঠোঁট গুলো যে আজ বড়ই তৃষ্ণার্ত…

শরীর চেনার আগে যে ভালোবাসা, তার মত পবিত্র বিষয় পৃথিবীতে খুব কমই আছে। আঙুল ধরে হাঁটছি দুজন।
-দীপ, একটা কবিতা বল।
-কবিতা টবিতা খুব একটা জানিনা।
-তোমার কবিতা শুনে আমি তো আর পটে যাব না।
-তোমায় পটিয়ে অনেক আগেই তো ভালোবাসার মানুষ বানিয়েছি।
-কাক আর কবির সংখ্যা কিন্তু এদেশে খুব বেড়ে যাচ্ছে।
-“তুই আমার শিরায় শিরায় বিষ
তুই আমায় জ্বালাস অহর্নিশ”।
-ভালো লাগেনি, হার্ডকোর ছড়া।
-হুম।
-ইয়াবা মানে কি জানো?
-না, হঠাৎ ইয়াবা কেন?
-ইয়াবা থাই শব্দ, এর অর্থ পাগলা ওষুধ। মাসুম ভাইকে বলতাম এটা খেলে তুমি পাগল হয়ে যাবে। কিন্তু উনি শুনতেন না।
-পছন্দ করতে ওনাকে?
-হুম, কিভাবে বুঝলে?
-টেলিপ্যাথি।
-মাসুম ভাইকে একটু আধটু পছন্দ করতাম। তবে ভালোবাসার মানুষ হিসেবে না। ভালো মানুষ হিসেবে, কিন্তু লোকটা নেশা করে আজ পাগল হয়ে গেছে।

রাস্তার পাশে বড় লেক। টলটলে পানি, দেখতে কাচের মতই স্বচ্ছ। লাল শাপলা ফুটেছে অনেক, দেখতে ভালো লাগছে বেশ। অনিক কে উদ্দেশ্য করে বললাম,
-কেউ যদি আমায় লাল শাপলা দিয়ে প্রপোজ করে, তাহলে আমি না করবো না।
-তাহলে তো আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।
-তাইতো শুধু তোমাকেই বলেছি। যাতে কেউ না জানে।
-বুদ্ধি আছে দেখছি তোমার।
-তোমার স্থান বোকাদের দলে। কিন্তু আমি তোমার থেকেও বেশী বোকা। কারণ জেনে শুনে বোকা মানুষকে এই মনটা দিয়ে ভালবেসেছি।
-হা হা হা।
-ভালোবাসি তোমায়।
-আমার তো ইচ্ছে করে তসবি টিপে বার বার বলি, ভালবাসি তোমায়, ভালোবাসি তোমায়, ভালোবাসি তোমায়।
তুলে এনে লাল শাপলা দিলাম ওকে। শাপলাগুলো ওর হাতে মানিয়েছে বেশ(আমার ভালবাসার দৃষ্টিতে দেখা এজন্য হয়তোবা)!

জীবনটা ম্যারাথন দৌড়ের মত প্রতিযোগিতা পূর্ণ। টিকে থাকার জন্য প্রতিটা ধাপেই ভালো পারফর্ম করতে হয়। অনেকে বলে থাকে, জীবনে কিছুই করতে পারলাম না। কিন্তু এটা ভুল। কারণ জীবন কিন্তু প্রত্যেককেই অনেকগুলো সুযোগ দেয়। আমরা(অনিক এবং আমি) সেই সুযোগ যে খুব ভালো ভাবে কাজে লাগিয়েছি তাও কিন্তু না। আবার দৌড় থেকে ছিটকেও পড়িনি। সেই ম্যারাথন দৌড়েরই অংশ হিসেবে স্কুল, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়, সাঁতরে পার হয়েছি। কিন্তু সম্পর্ক টাও একই রকম থেকেছে। কিংবা আরও ভালো হয়েছে। এবং প্রতিনিয়ত অনেক বেশী সাপোর্ট পেয়েছে। অনিকের বাবার হার্ট এটাক হল। তখন থেকেই একমাত্র সন্তান অনিকের উপর বিয়ে করার চাপ আসে। আমি বিবেকের সাথে দোটানায় পড়ে যাই। অনিককে বলি একমাত্র সন্তান হিসেবে মৃত্যুপথের দিকে এগিয়ে যাওয়া বাবার ইচ্ছেটা তোমার পূরণ করা উচিৎ। কারণ বাবা তোমার দিকে তাকিয়ে সব কিছুকেই মানিয়ে নিয়েছেন। ওর পাশে থাকবো এই আশ্বাসে, আর বাবার ইচ্ছের কারণে অনিক কে শেষ মেষ রাজি করালাম। অতি শোকে মানুষ বিধ্বস্ত হলে, চোখও আর তখন পানির জোগান দেয় না। হয়তোবা দুজনের তখন তেমনটাই হয়েছিলো।

রাতে অনিকের একটা SMS পেয়ে বাসার ছাদে গেলাম। মাথার উপর চাঁদনিরাত, নিঃশব্দ জ্যোত্স্নান, নির্বিকার দুজনেই, নীরবতা ভেঙে অনিক কান্না জড়ানো কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“দীপ, তুমিও ভাল আর আমিও ভাল। কিন্তু আমাদের আর একসাথে ভালো থাকা হল না”
তারপর আর কোন কথা শোনা যায়নি। শুধু প্রচণ্ড দ্রুত মমতার শক্তিতে, দুজন দুজনকে জরিয়ে ধরলাম। বাতাসে শুধুই হাউ মাউ করে চাপা কান্নার শব্দ, যে কান্না আসে শুদ্ধতম ভালোবাসা থেকে। সময় এত নিষ্ঠুর কেন?

চাচ্ছিলাম অনিক ওর বাকি জীবনটা সমাজের দেয়া সুন্দরী বৌয়ের সাথেই কাটাক। যেখানে দীপ নামটা শুধুই উজ্জ্বল অতীত, স্মৃতিতে থাকা দীপ আর অনিকের বিশুদ্ধ ভালোবাসার স্বপ্ন শুদ্ধতম হয়েই থাক। অনিকের বিয়ের দিনই, ওকে না জানিয়ে আগের থেকে তৈরি পাসপোর্ট ভিসায় বাংলাদেশ ছাড়ি। উচ্চতর ডিগ্রীর জন্যে। না, ওর বৌকে দেখা হয়নি। প্রকৃতিগত ভাবেই মানুষ হিংসুক প্রাণী। কিন্তু আমি হিংসে থেকে না। এমনিতেই ইচ্ছে করেই দেখিনি। তীব্র ভাবে চাচ্ছিলাম সুন্দর সাজানো সংসারে ও যেন সুখের সময় কাটাতে পারে। দেশের বাইরে অনিককে ভুলে থাকার চেষ্টায় ওর সমস্ত নাম্বার ডিলিট করলাম। এমনকি ল্যাপটপে থাকা ছবিগুলোও। ওর সাথে যোগাযোগের সমস্ত উপায় ইচ্ছে করেই হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি। কিন্তু পরে ওকে পাশে না পেয়ে আমার দম বন্ধ লাগছিলো। ওর স্পর্শহীন জীবন আমার কাছে ছিল শীতের শুষ্কতার মতো। তীব্র মন কষ্ট থেকে ওর সাথে আবারও একটু যোগাযোগের আশায় কত কি ই না করেছি। ওর ছবি একে পোস্ট দিয়েও ওকে খোজার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ছবিটা মোটেও ওর মত হয়নি। আমার ভালোবাসা পবিত্র, তার স্থান আমার মনের ঘরে। তার মতো করেই আমি সেই ঘরের চাবি হারিয়ে ফেলেছি।

কয়েক বছর পর:-

ঢাকায় একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করছি। কোম্পানি মোটা অঙ্কের টাকা স্যালারি দিচ্ছে, কলিগদের কয়েকজনের সাথে বেশ ভাল সম্পর্ক। বিশেষ করে ওবায়েদ ভাই আর নাজনীন আপা। দেশে ফিরেও অনিকের সাথে আর যোগাযোগ করিনি। কিংবা যোগাযোগের চেষ্টাও করিনি। শুনেছি সন্তানের বাবা হয়েছে ও। মন থেকে শুধু তীব্র শুভকামনা অনিক আর ওর পরিবারের জন্য, যেখানেই থাকুক না কেন ও যেন ভালো থাকে। ছোট ছোট বিচ্ছেদ সম্পর্ক শক্ত করে, আর বড় বিচ্ছেদ সম্পর্ক ধ্বংস করে। কিন্তু আমি জানতাম আমাদের সম্পর্কটা ধ্বংস হয়নি। আর হবেও না, শুধু ভালোবাসার সিন্দুকের চাবি টাই হারিয়ে ফেলেছি আমরা।

সুযোগ পেলেই ওবায়েদ ভাই আর নাজনীন আপার সাথে আড্ডা দেই। আমার বিয়ে না করা নিয়ে ওদের বড়ই দুশ্চিন্তা, সেই সাথে বাড়ির থেকে আব্বু আম্মুর চাপ তো আছেই। কদিন আগে আমার ছোট্ট ফ্লাটে এসেছিলো ওবায়েদ ভাই চা-জল খাবারের দাওয়াতে। দু দিন পর নাজনীন আপা হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিলো।
-অপুর জন্মদিনের কার্ড, কেমন হয়েছে?
-বেশ ভাল।
-তাড়াতাড়ি আসবেন।
-আচ্ছা।
-আমি আর আমার হাসবেন্ড দুজনেই যার যার কাজে ব্যস্ত থাকি। ছেলেটাকে থুব একটা সময় দিতে পারি না।
-আমি না হয় অপুকে সময় দেব। কথাটা শুনে নাজনীন আপা হেসে বললো, আগে তুমি বিয়ে করো!

বেশ দামি কিছু খেলনা নিলাম গিফট হিসেবে। সন্ধ্যে বেলা কলিং বেল চেপে দরজা খুলতেই অতিথিদের হৈ হুল্লোড়ের শব্দ পেলাম। ভিড়ের ভিতর যার জন্মদিন তাকেই দেখছিলাম না। এরই মধ্যে নাজনীন আপা এসে একটা মিষ্টি হাসি দিলো, ওর হাসবেন্ডকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য ডাকল।
-অনিক, এই অনিক।
আমার অতি প্রিয়। কিন্তু নস্টালজিয়া পূর্ণ নামটা শুনে একটু চমকে গেলাম ই বটে। কিন্তু আমার জন্যে যে রাজ্যের চমক অপেক্ষা করছে। সেটা সন্দেহ করারও ইচ্ছে হয়নি।
আমার সামনে দাড়িয়ে অনিক!!!
আমার আত্মার অংশ, যার স্পর্শে আমি ভালোবাসার জন্য চোখের জল ফেলতে শিখেছি। যাকে জড়িয়ে ধরে শুধুই কেঁদেছি, এই অনিকই তো পিপাসায় ব্যাকুল হয়ে থাকা আমার চোখের তৃষ্ণা মেটাত, ওর চোখে তাকিয়েই তো সব ভুলে থাকা শিখেছি।
মায়ায় জড়াতেই যত ভয়, মায়ায় জড়ালে যে কষ্ট পেতে হয়…।
কিন্তু সময় তো চলেই যায়।
আর এখন?
এখনও, অনিক আমার আত্মার পরমাত্মা। শুধু নাজনীন করীম আপু থেকে ভাবীতে রূপান্তরিত হয়েছে! অপু আমাদেরই সন্তান। অনিকের স্পর্শে আজো আমি ভালোবাসার গন্ধ পাই।

‘দুঃখের সময়কে আমি স্বাগত জানাই, কারণ তারপরেই যে সুখের সময় আসে’

পড়ন্ত বিকেল, আমার আঙুল অনিকের মুঠোয়।
সামনে দিগন্ত বিস্তৃত পিচ ঢালা পথ…।

2 thoughts on “পিচ ঢালা পথ – পিয়াল ইশতিয়াক প্রাচুর্য

  1. কারো গৃহপালিত স্বামী হবার জন্যই তোর জন্ম।

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s