“চেকপোস্ট” লেখকঃ Extream Noise

২৬ আগস্ট ২০১১
লালমনিরহাটের বুড়িমারি আইসিপির ১৫নং বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নে সেদিন আমি মেজর হিসেবে শপথ গ্রহন করি। ছোট বেলা থেকে খুব শখ ছিল পুলিশ হবার। কাঁধে অস্ত্র, পরনে ইউনিফর্ম, মাথায় সম্মানের টুপি পড়ে যখন কোন পুলিশ অফিসারকে সিনা টান করে যেতে দেখতাম, তখন আমারও খুব ইচ্ছা হত তার মত করার। আর সেই ইচ্ছা আজ নিয়তি হয়ে আমাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে।

আপন বলতে তেমন কেউ ই ছিল না আমার। ছোট বেলায় মা মারা গেছে, বাবা নতুন বিয়ে করে তার নতুন পরিবার ও ব্যবসা নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে গেলেন। একটা পর্যায়ে আমাকে ফুপুর কাছে রেখে তারা চলে গেলেন কানাডা। শুনেছি আমার ছোট ছোট দুটো ভাইও আছে। যদিও এখনো তাদের দেখিনি, ফুপুর মুখে শুনেছিলাম। প্রথম দিকে বাবা প্রতি ছ’মাসে একবার এসে আমাকে দেখে যেতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তার আসার ঘনত্ব কমে গেল। বুঝতে পারছিলাম আমার গুরুত্ব বাবার কাছে এখন আর তেমন নেই। তাই নিজে থেকেই সব কিছু মেনে নিলাম। মা বাবা বিহীন ১৬টি বছর কাটিয়েছি। তার মধ্যে ১৩ বছর আমাকে বেচে থাকার প্রেরণা যুগিয়েছিল আদনান। আদনান, আমার খেলার সাথী, প্রাণের সাথী, ভালবাসার প্রথম স্পন্দন। ছিল! একদিন জানলাম তাকে নিয়ে এসব শুধু আমি ই ভাবতাম। সে শুধু আমাকে একজন বন্ধু হিসেবেই দেখছিল। তাই একদিন আমার ভালবাসাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সে বিয়ে করে সংসারী হয়ে গেল। আর আমি আবার একা! আসলে আবার বললে ভুল হবে। আমি তো ছিলামই একা। শুধু শুধু কাউকে আপন ভেবে ভুল করতাম মাঝে মাঝে।

আজ থেকে লালমনিরহাটে আমার জীবনের নতুন একটা অধ্যায়ের সূচনা হল। প্রথম দিনেই সহকর্মীরা আমাকে খুব আপন করে নিলো। ভালই লাগছিল দিনটাকে। বিকেলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আমাকে বুড়িমারি আইসিপি চেকপোস্টে নিয়ে গেলেন। আমাকে এই একই চেকপোস্টে কর্মরত ভারতীয় বিএসএফ সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সেখানে বাংলাদেশের ও ভারতের সীমান্তের দায়িত্বে নিয়োজিত অনেক কর্মকর্তারা ছিলেন। সবাই নিজের তরফ থেকে আমার উদ্দেশ্যে কিছু উপদেশমূলক ভাষণ দিলেন। শেষে সবাই এসে একে একে আমার সাথে পরিচিত হলেন। হঠাৎ সেখানে ভিড়ের মাঝে আমার নজর কাড়ল এক যুবক। তার ইউনিফর্ম দেখেই বুঝতে পারলাম সে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদস্য। এক পর্যায়ে সেও এসে আমার সাথে হাত মেলাল।
– Hi, I am Sub-Inspector Shubhas Roy. Welcome to the border…
– নাম শুনে তো বাঙালি মনে হচ্ছে। by the way, I am Major Saiful Islam. In short you can call me Saif…
– হাহাহা… আমার বাড়ি কলকাতায়। জাতে যাই হই না কেন, এখানে পরিচয় একজন ইন্ডিয়ান হিসেবেই।
আর কথা বলার সুযোগ পাইনি তখন। ক্যাম্পে ফিরে বিশ্রাম করলাম। পরদিন থেকেই পুর্নাঙ্গ ডিউটি শুরু। রাতে খাওয়ার পর বর্ডারের পাশে দিয়ে হাঁটছিলাম। চাঁদনী রাত। ভরা চাদের আলোয় আশে পাশে খুব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। একই জমিন, কোন পার্থক্য নেই। এপারের বাতাস নির্বিঘ্নে ওপারে গিয়ে আবার ফিরে আসছে। মাঝখানে শুধু এই কাঁটাতারের বেড়া দিয়েই দুটি দেশকে আলাদা করা হয়েছে। আর দুপাশেই মেশিনগান হাতে প্রতি পঞ্চাশ গজ দূরে দূরে অবস্থান করছে দু দেশের সীমান্তের পাহারায় নিয়োজিত সৈনিকরা। কাল থেকে হয়ত আমাকেও এভাবে কোথাও দাড়াতে হবে।

পরদিন থেকে যথারীতি ডিউটি শুরু করলাম। কয়েক দিন পর আমার স্থান পরিবর্তন করা হল। আর এবার আমাকে ঠিক এমন একটা জায়গায় দেয়া হল যেখানে আমার ঠিক উল্টো পাশেই সুভাসের ডিউটি ছিল। খুব খুশি হয়েছিলাম এটা ভেবে যে এখন অন্তত একটু বিরক্তিহীন ভাবেই কাজ করা যাবে। তাই বর্ডারের এপার থেকেই ওপারে সুভাসের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতাম। দুদিনেই ওর সাথে খুব ভাল একটা বন্ধুত্ব হয়ে গেল। ভালই কাটছিল দিনগুলো। হঠাৎ একদিন সুভাস বলল কাল থেকে ওকে রাতে ডিউটি করতে হবে। কতদিন তা জানে না। শুনে মনটা কেন জানি খুব খারাপ হয়ে গেল। পর পর তিন দিন আমি একাই সেখানে ডিউটি করলাম। কিছুতেই ভাল লাগছিল না। আশে পাশে নিজের অনেক সহকর্মী থাকলেও কেন জানি আমি তাদের সাথে তেমন একটা মানিয়ে নিতে পারতাম না। কেন জানি না বার বার সুভাস কে খুব মিস করতাম। কেন জানি ওর সাথে গল্প না করলে আমার সময় কাটতই না। কেন জানি ওকে দেখলেই আমার আদনানকে খুব মনে পড়ত। সেই চোখ, সেই চাহনি। মনে হত সুভাস যেন আদনানেরই আরেকটি রূপ।

পরদিন কর্নেলের সাথে কথা বলে রাতে ডিউটি নিয়ে নিলাম। সন্ধ্যার পরে গিয়ে দেখি ওপারে বর্ডারের পিলারের সাথে পিঠ হেলান দিয়ে বসে আছে সুভাস। যদিও এই পিলার থেকে দুদিকে আমাদের অবস্থান কমপক্ষে ১০ গজ পেছনে থাকার কথা। এখন আমার বদলে অন্য কেউ হলে নিশ্চয়ই গুলি করে দিত ওকে। আশে পাশে দেখে নিলাম কেউ আছে কিনা। সুবিধাজনক অবস্থা দেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সুভাসের কাছে। কাছাকাছি যেতেই পায়ের নিচে কিছু একটা পড়ে শব্দ হওয়ার সাথে সাথে লাফ দিয়ে উঠে আমার দিকে রাইফেল তাক করে দাড়িয়ে পড়ল সুভাস। আমি হতভম্ব হয়ে দুহাত উপরে তুলে বললাম,
-দাড়াও সুভাস, আমি সাইফ।
-সাইফ…! তুমি এখানে, এই সময়।
-তোমাকে চমকে দিতেই এসেছিলাম।
-তাই বলে এভাবে! এটা যদি আমি না হয়ে অন্য কেউ হত? তাহলে এখনি তোমাকে গুলি করে ফেলত।
-তা ঠিক, কিন্তু আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে গুলিটা তোমার গায়ে আরো অনেক আগেই পড়ত।
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে রাইফেল নামিয়ে নিলো সুভাস। আশে পাশে দেখে নিয়ে দুজনেই বসে পড়লাম সেই পিলার ঘেঁসে। দুজনের মধ্যেকার দূরত্ব এখন শুধু ৫ ইঞ্চির একটা পিলার। আর দুজন বসে আছি দুটি আলাদা আলাদা দেশের মাটিতে। ভাবতে ভালই লাগছিল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর সুভাস মুখ খুলল,
-তাহলে তোমাকেও নাইট শিফটে দিয়ে দিল।
-দেয়নি। নিয়ে নিয়েছি। তোমার শিফট চেঞ্জ হবার পর আমার একা একা খুব বিরক্ত লাগছিল। কেন জানি কিচ্ছু ভাল লাগছিল না। তাই কর্নেলকে বলে শিফট চেঞ্জ করলাম।
-তার মানে কি তুমি আমার জন্য শিফট চেঞ্জ করলে??
-মনে কর তাই।
-কিন্তু কেন? আমি কে তোমার ?
সুভাসের এই প্রশ্নটা যেন আমাকে নড়িয়ে দিল। আসলেই তো, সুভাস কে আমার? কি সম্পর্ক ওর সাথে আমার যে ওর প্রতি এতটা টান অনুভব করছি আমি? কি উত্তর দেব আমি ওকে? তাই উল্টো ওকেই প্রশ্ন করলাম,
-কি সম্পর্ক হতে পারে আমাদের মাঝে?
-হুম। নিয়ম তান্ত্রিক ভাবে এই কাটা তারের বেড়ার দুপাশে আমরা একে অপরের শত্রুপক্ষ হিসেবেই নির্ধারিত।
-এর বাহিরে কি কোন সম্পর্ক হতে পারেনা আমাদের?
-হ্যাঁ পারে। হতে পারে ভাই, হতে পারে বন্ধুত্ব, হতে পারে ভালবাসার সম্পর্ক!
ওর কথা শুনে কেন জানি আমি খুব বেশি সাহস পেয়ে গেলাম। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বের হয়ে গেল,
-সুভাস, আমি তোমাকে ভালবাসি!
সে কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর আমি ই বললাম,
-কি হল, কিছু বলছ না যে…
-ভাবছি কি বলব।
আবার কিছুক্ষণ নীরবতার পর সুভাস বলল,
-জানো সাইফ, তুমি আমাকে ভালবাসার কথা বলাতে আমি তেমন আশ্চর্য হইনি। জাস্ট পেছনের কিছু কথা ভাবছিলাম। প্রথম দিনে তোমার সেই নম্র আচরণ, এত মানুষের ভিড়ে নিজে থেকেই আমার সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা, আমার জন্য রাতের ডিউটি নেয়া, যখন আমাকে একটা গুলি করেই তুমি বড় সম্মানের অধিকারী হতে পারতে তখনও তা এড়িয়ে যাওয়া। এতে আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম যে তোমার মাঝে হয়তবা আমার প্রতি কিছু একটা ব্যাপার আছে। আর এটা একমাত্র একজন সমকামীই বুঝতে পারবে অন্য কেউ না।
-তার মানে, তুমিও…
-হ্যাঁ আমিও। তোমার কি মনে হয় একজন সাব ইন্সপেক্টরকে কেউ চাইলেই দিন থেকে রাতের শিফটে পাঠিয়ে দিবে? সেটা আমি নিজে থেকেই করেছিলাম তোমার অবস্থান বোঝার জন্য। তোমার কি মনে হয় তুমি আবেগের বশে আমাকে গুলি করনি বলে আমিও তোমাকে করবনা? সেটাও করিনি শুধু তোমার মানসিকতা বোঝার জন্য। তোমার সম্পর্কের প্রশ্নে আমি ভালবাসার অপশনটা না রাখলেও পারতাম। রেখেছিলাম শুধু তোমাকে সুযোগ দেওয়ার জন্য। আর এই সব আমি কেন করেছি জানো? কারণ আমিও তোমাকে ভালবাসি…

ওই মুহূর্তে আমার মুখে কোন কথা আসছিল না। কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। চোখ থেকে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। এ কোন দুঃখের অশ্রু নয়, আনন্দ অশ্রু। এই প্রথম কাউকে নিজের আপন মনে করতে পারার অশ্রু। তারের নিচ দিয়ে সুভাসের হাতের উপর হাতটা রাখলাম। সেও তার আঙ্গুল দিয়ে আমার আঙ্গুল গুলোকে আঁকড়ে ধরল। জানি এই কাটা তারের বেড়া পেরিয়ে আমাদের ভালবাসার মাঝে আর কিছু সম্ভব না। তার পরেও স্বপ্ন দেখতে দোষ কি।

এভাবেই চলছিল আমাদের বর্ডার বর্ডার প্রেম। রাতের আধারের ল্যান্স নায়েক, কর্নেল ও সিপাহীদের চোখ এড়িয়ে রাতের পর রাত আমরা এভাবে পিঠে পিঠ ঠেকিয়ে কাটিয়েছি। এক পর্যায়ে আমার দুজনেই আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে লাগলাম। দুজনেই সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা চাকরি থেকে অব্যাহতি নেব। তার পর দুজনে চলে যাব দূরে কোথাও, যেখানে আমাদের মাঝে থাকবেনা আর কোন বর্ডার। থাকবেনা কেউ দেখে ফেলার ভয়। পিলারের দুপাশে বসে থাকতে হবেনা আর আমাদের।

মাস দুয়েক পর আমি ৩ দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় গেলাম। সেখানে গিয়ে ফুপুর সাথে দেখা করে, বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সিতে যোগাযোগ করে আরো দুই সপ্তাহ পরের ডেইটে ফ্রান্সের টুরিস্ট ভিসা সংগ্রহ করলাম। তারপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সুভাসের কলকাতার ঠিকানায় কুরিয়ার করে দিয়ে লালমনিরহাটে ফিরলাম। ক্যাম্পে ফিরেই এখানকার আবহাওয়া কেমন যেন গুমোটে মনে হল। পরে জানতে পারলাম, গত রাতে এখানে কয়েকজন বেসামরিক নাগরিকের অবাধে বর্ডার দিয়ে যাতায়াতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দু দেশের সীমান্ত রক্ষীদের মাঝে ব্যাপক গোলাগুলি হয়েছিল। আর এতে বাংলাদেশের ৪ জন ও ভারতের ৫ জন সেনা সদস্য আহত হয়েছে। একথা শুনে আমার ভেতরে যেন একটা তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। ছুটে গেলাম বর্ডারের সামনে সুভাসের খবর নিতে। কিন্তু গিয়ে দেখলাম ওর জায়গায় অন্য একজন দাড়িয়ে আছে। গোপন মাধ্যমে জানতে পারলাম, গতরাতের ঘটনায় সুভাস গুলিবিদ্ধ হয়ে এখন হাসপাতালে। আমার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল কেউ আমার বুক থেকে খাবলা মেরে আমার হৃদয় টাকে বের করে নিয়ে গেল। সৃষ্টিকর্তার উপর খুব রাগ হচ্ছিল। সে কেন বার বার আমার আপনজনকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়।

পরদিন আমি আর নিজেকে মানাতে পারছিলাম না। সুভাসকে না দেখে আমি এক বিন্দুও থাকতে পারছিলাম না। কিন্তু আমি যে একজন সামরিক কর্মকর্তা। আমি তো চেকপোস্ট পার করে কিছুতেই সুভাসের কাছে যেতে পারব না। তাই নিজের সব সামরিক পরিচয় গোপন করে একজন ব্যবসায়ীর পরিচয়ে বুড়িমারি আইসিপি পার করে ভারতে পা রাখলাম। যেহেতু প্রথম দিনের পর আমার আর এখানে আশা হয়নি আর এখানকার কর্মচারীদের বার বার শিফট চেঞ্জ হতে থাকে তাই আমাকে কেউ চিনতে পারেনি। সোজা চলে গেলাম সীমান্তের নিকটবর্তী হাসপাতালে যেখানে আমার সুভাসকে রাখা হয়েছে। মনে মনে ভেবে রাখলাম, সুভাসের কাছে গিয়ে ওর পা ধরে ক্ষমা চাইব। আর এখনি ওকে এখান থেকে নিয়ে আমি চলে যাব সকল বাধার ওপারে।

হাসপাতালে ঢুকে একে ওকে জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু কেউই বলতে পারল না সুভাস কোথায়। অবশেষে একজন বৃদ্ধা নার্স কে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, সীমান্তে গুলিবিদ্ধ কয়েকজন সেনা সদস্যকে এখানে রাখা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩ জনকে ভাল চিকিৎসার জন্য দিল্লি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর বাকি দুজনের লাশ আজ সকালে নিয়ে গেছে। বৃদ্ধা কারো নাম বলতে পারেনি। তবে এটুকু বলেছিল, ওই দুজনের একজন বিহারের ও আরেকজন কলকাতার ছেলে। একথা শুনে আমার আর বুঝতে বাকি নেই যে আমি আমি আমার শেষ সম্বল টুকুও হারিয়ে ফেলেছি। আমার চারিদিক যেন ঘুরছিল। চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসছিল। আমি যেন পড়ে যাচ্ছিলাম। তারপর… তারপর…

হঠাৎ চোখ খুলে দেখলাম আমার দিকে অগ্নিমূর্তি হয়ে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ ও ভারতের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা। আর একদল সেনা সদস্য আমার দিকে বন্দুক তাক করে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম যে আমি এখন বন্দি। সুভাসের মৃত্যুর খবর শুনে আমি ওখানেই অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। আর পরিচয় খুঁজতে গিয়ে তারা আমাকে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। আর বাংলাদেশের সামরিক নাগরিক হওয়ায় এখন উভয় দেশের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা আমার কাছে একটাই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছেন। “আমি কেন ব্যবসায়ীর পরিচয়ে ভারতে গিয়েছিলাম?”

কি উত্তর দেব আমি? সত্যি বলব? না না তাহলে তারা আমার আর সুভাসের সম্পর্কের কথা জেনে যাবে। ভারতীয়দের চোখে সুভাস একজন শহীদ। সবাই এখন সুভাসের আত্মার শান্তি কামনা করছে। ওকে সম্মান করছে। আর আমাদের সম্পর্কের কথা জানলে সবাই এখন সুভাসকে ঘৃণা করবে। ওর প্রতিকৃতিকে থুথু দেবে সবাই। না না এটা আমি হতে দেব না। তাহলে কি বলব আমি। কি ওজুহাত দেখাব। একজন সামরিক সদস্য হিসেবে আমি কোন কারণেই পরিচয় গোপন করে ভারতে যাওয়ার অনুমতি পাই না। তাহলে কি জবাব দেব আমি এখন। তাই চুপ করে রইলাম। তারা অনেক চেষ্টার পরেও আমার কাছে কোন উত্তর না পেয়ে আমাকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করল। সাথে সাথে আমার কাছ থেকে সব সামরিক পরিচয় ছিনিয়ে নেয়া হল। পরিচয় গোপন করে ভারতে যাওয়ায় আমাকে দুষ্কৃতিকারী ও দেশদ্রোহিতার অপরাধে আটক করা হল।

সব কিছুই কেমন যেন একটা ঘোরের মত লাগছিল। মনে হচ্ছিল আমি যেন কোন দুঃস্বপ্ন দেখছি। গত ছয় দিন যাবত আমি সীমান্তের গোপন কারাগারে বন্দী। আমার নীরবতার সুযোগ নিয়ে উপরস্থ ব্যক্তিরা এর আগে সীমান্তে ঘটে যাওয়া অনেক গুলো অপরাধের আসামী করে দিল আমাকে। আর এখন আমার নতুন পরিচয় আমি একজন দেশদ্রোহী…
হঠাৎ একজন এসে বলল, আমাকে নাকি সকালে চেকপোস্টে নিয়ে যাওয়া হবে। কথাটা শুনে ওই লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে দিলাম আমি। লোকটি চলে গেল। যেতে যেতে হয়ত আমাকে পাগল বলেছিল। কারণ তার ধারনা আমি জানিনা কাল চেকপোস্টে কি হবে আমার সাথে।

সকালের স্নিগ্ধ আলো জেলখানার ছোট কুঠুরি দিয়ে আমার মুখের উপর পড়ল। হিম শীতল পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিলাম। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে নিজেকে একবার শেষ বারের মত দেখে নিলাম। কেন জানি মনে মনে খুব হাসি পাচ্ছিল। দুজন এসে আমাকে সাদা রঙের পাঞ্জাবী টাইপের একটা পোশাক পরিয়ে দিল। ২০-২৫ জন আমাকে ঘিরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে চেকপোস্টের দিকে। যেন আমার বিয়ের বরযাত্রী যাচ্ছি। হাহাহা…

সুভাস, তোমার আর আমার স্বপ্ন আজ সত্যি হতে যাচ্ছে। তুমি আমাকে রেখে একা চলে গেছ তাতে কি, আমিও আসছি তোমার কাছে। যেখানে তোমার আর আমার মাঝে থাকবেনা কোণ বর্ডার, থাকবেনা কেউ দেখে ফেলার ভয়, দুজনের মাঝে থাকবেনা কোন পিলারের বাধা। আমি আসছি সুভাস। দেখ সবাই আমাকে তোমার কাছে পাঠানোর জন্য কত সুন্দর করে সাজিয়েছে। আমি আসছি সুভাস আমি আসছি। আর একটু পরেই আমাকে দাড় করানো হবে সেই চেকপোস্টের ঠিক মাঝখানে যেখানে তোমাকে আমি প্রথমবার দেখেছিলাম। আর তারপর দুদিক থেকে অনবরত গুলি বর্ষণ হবে আমার উপর। ঠিক যেমনটি তোমার সাথে হয়েছিল। জানো সুভাস, ওরা বলছে, দু দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্যই নাকি আমার বিচার টা এভাবে গোপনে করা হচ্ছে। কিন্তু ওরা কি বোকা দেখেছ… ওরা বুঝতেই পারেনি আমি ওদের সম্পর্কের জন্য না, তোমার আর আমার ভালবাসার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্যই সব মেনে নিচ্ছি। তোমার কি একা একা খুব কষ্ট হচ্ছে সুভাস? চিন্তা করো না লক্ষ্মী সোনা, এইতো আর কয়েকটি মুহূর্ত। আমি আসছি সুভাস… আমি আসছি…

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s