বসন্তের পাখি

আজও ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে ঘুম ভাঙল।বাবা আমার ঘরে এসে বললেন,আবার সেই স্বপ্ন দেখেছিস?
-তুমি আসলে কেন? আমারতো অভ্যাস হয়ে গেছে।
বাবা কিছু না বলে একটু সময় থেকে বললেন,ঘুমানর চেষ্টা কর।ভয় পেলে আমাকে ডাকিস। আমি খেয়াল করছি আমার মা কখনও এভাবে মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে আসেন না অথচ এসব ক্ষেত্রে মায়েরাই সাধারণত আসেন। কারণটা এই না যে তিনি আমাকে ভালবাসেননা। যথেষ্ট ভালবাসেন তবে তার ভালবাসায় হয়তো বাবার মতো এত উৎকণ্ঠা নাই। তাই আমার সামান্য ভয়ের আওয়াজে তার ঘুম ভাঙেনা।

এখন বলি ভয় পাওয়ার কারণ, রাতে যখন গভীর ঘুমে থাকি তখন হঠাৎ আমার মনেহয় আমি পাশ ফিরতে পারছিনা। আমার উপর পাথর চেপে আছে। আমি যত চেষ্টা করি নড়াচড়া করতে কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে তত তার মাঝে চেপে ধরে। একসময় আমি হাল ছেড়ে দিয়ে পড়ে থাকি। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার মনে হয় আমি নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছি ততক্ষণ পর্যন্ত সেই অশুভ শক্তি আমাকে ছাড়েনা এবং ছাড়ার সাথেসাথেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় কিন্তু এটা যে স্বপ্ন ছিল সেটা বুঝতে আরও সময় লাগে। কোনকোনদিন ঘুম ভাঙ্গার পর শরীরে ব্যথা থেকে যায়। এরপর ভয়ে আমি আর ওইরাতে ঘুমাইনা যদি ঐ অশুভ শক্তি আবার ফিরে আসে। এভাবে কত নির্ঘুম রাত যে আমার গেছে।

হুজুরের তাবিজ আমার গলায়, জানালায়, দরজায় ঝুলছে। তারপরও কাজের কাজ কিছুই হলনা। শেষে আমার এক বন্ধুর পরামর্শে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গেলাম। উনি বললেন এটা শারীরিক দুর্বলতা থেকে হয়, নির্দিষ্ট একটা বয়সের পর আপনাতেই সেরে যায়। ঘুম ঠিক আছে শুনে উনি আমাকে কিছু ভিটামিনস দিলেন আর এইবিষয় নিয়ে না ভাবতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু কথায় বলেনা যেই লাউ সেই কদু।আমার বেলায়ও তাই হল,লাউ কদুই থেকে গেল কুমড়া হলনা। মানে আমার অসুখ অসুখই থেকে গেল। এরমধ্যে বাবা তার কলিগ শাহজাহান আঙ্কেলের কাছ থেকে শুনে এসেছেন এরকম শ্বাসরুদ্ধ হয়ে কে নাকি ঘুমের মধ্যে মারা গেছে। সেই থেকে বাবার চিন্তা আরও বেড়ে গেছে। এই অতিরিক্ত ভালবাসা কিংবা উৎকণ্ঠা যেকারণেই হোক বাবা আমার জন্য খুব অদ্ভুত একটা ব্যবস্থা করলেন। আমাকে বললেন, কাল থেকে তোর সাথে একটা ছেলে থাকবে।
-মানে?
-মানে তুই একা ঘুমাবিনা, তোর সাথে আরেকজন থাকবে।
– আমার বিছানায়?
-তো আর কোথায়,সে কাজের লোক টাইপের ছেলে না যে মেঝেতে ঘুমাবে। তোর ঘুমের মধ্যে ঐ সমস্যা হলে সে তোকে ডেকে দিবে। অল্পতে ডেকে তুললে আর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে জাগতে হবেনা।
-আমার সাথে কাউকে থাকতে হবেনা।
-থাকতে হবে কি না সেটা আমি জানি। রাতে আমি ঘুমাতে পারিনা ঐদিনের পর থেকে যেদিন শুনছি এভাবে ঘুমের মধ্যে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মানুষ মারা যায়।
-তাহলে কাজের লোক টাইপ কাউকে রাখ যে মেঝেতে ঘুমাবে।
-হু, এরকম কেউ রাখি আর ঘুমের মধ্যে আমাদের সবাইরে ট্যাবলেট খাইয়ে সবকিছু নিয়ে পালিয়ে যাক।

আমার উচ্চ-রক্তচাপের রোগী বাবার কথা চিন্তা করে আমাকে রাজি হতেই হল। আমি চাইনা আমার জন্য আমার বাবার অসুখ বাড়ুক। পরদিন বিকেলে বাক্স পেটরা নিয়ে বাবার সাথে এক লোক এসে হাজির। বয়স আমার থেকে বছর দুয়েকের বেশি হবে। আমার পাশের ঘরে তার জিনিসপত্র সব রাখা হল। সে ওখানেই থাকবে শুধু রাতের বেলা আমার ঘরে এসে থাকবে। বাবা তার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। জহির এই হল আমার ছেলে শিমুল। তাকে দেখেই আমার হনুমানের কথা মনে হয়ে গেল। ছোট বেলায় এরকম উসকোখুসকো মাথার চুল থাকলে প্রায় ই আমাকে হনুমানের সাথে তুলনা করা হত। অনিচ্ছা সত্যেও জহির নামক হনুমানটার সাথে আমার হ্যান্ডশেক করতে হল।

জহির বাবার কলিগ শাহজাহান আঙ্কেলের দূরসম্পর্কের আত্মীয়, প্রায় ৩মাস হল চাকরি খুঁজতে সিলেট এসেছে। উনার বাসায়ই এতদিন ছিল, আমার বাবার চিন্তার কথা শুনে উনিই এই ব্যবস্থা করেছেন এবং এটা বলা বাহুল্য যে বাবার মনে আমার মৃত্যুর এই ভয়টা উনি ঢুকিয়ে দিয়েছেন যাতে উনার ঘাড় থেকে জহির নামের আপদটাকে নামিয়ে আমাদের ঘাড়ে চালান দিতে পারেন। আর কেউ হলে সাথেসাথেই দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ফেলত কিংবা অতি বুদ্ধিমান কেউ পাঁচও মিলিয়ে ফেলত কিন্তু আমার সহজ সরল বাবা দুইয়ে দুইয়ে তিনও মিলাতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ। আশ্চর্যের ব্যাপার হল আমার রাগ আমার বাবা কিংবা শাহজাহান আঙ্কেলের উপর না গিয়ে সব রাগ গিয়ে পড়ল ওই হনুমানের উপর। আমি ভাল করে তার সাথে কথাই বললাম না। মেজাজ খারাপ করে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম কিন্তু কাউকে বুঝতে দিলাম না। ফিরলাম রাত ৯টায়। আমার ঘরে আসার পর জহির এল আমার সাথে দেখা করতে। আমাকে বলল,
-কই ছিলা?
ওর মুখে তুমি সম্বোধন শুনে আমার মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল অথচ আমাকে কে তুমি বলল আর কে তুই বলল সেটা নিয়ে কোনদিনই আমার মাথাব্যথা ছিলনা। আমি ওরে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ওর কথার জবাব না দিয়েই ওয়াশরুমে ঢুকে গেলাম। এসে দেখি সে বিছানায় বসে আছে।
-তুমি কি আমার উপর কোন কারণে বিরক্ত?
– কই নাতো।
-তাইলে আমার কথার জবাব দিলেনা যে?
-আমি এমনই, সবসময় সব কথার জবাব দেইনা।
সে আর কোন কথা না বলে তার ঘরে চলে গেল। রাতে আমি, বাবা আর সে একসাথে খেতে বসলাম। নতুন একটা জায়গায় এলে মানুষের মাঝে যে সঙ্কোচ বা লজ্জা থাকে তারমধ্যে তার বিন্দুমাত্র দেখলাম না। উল্টো আমি মাছ খাইনা দেখে বক্তৃতা দেয়া শুরু করল মাছ না খেলে কি কি হয়, না হয়। তার কথায় মনেহল মাছ না খাওয়া একটা চরম অন্যায়।এটার জন্য আমাকে বাংলাদেশ অপরাধ-বিধি আইন অনুযায়ী ৫০০টাকা জরিমানা অনাদায়ে ৩দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।খুব বিরক্তি নিয়ে কোনমতে খাওয়া শেষ করে উঠলাম।

বিছানায় গিয়েও তার বকবকানি থেমে নেই,একসময় তার মুখের বুলি নাকের বুলিতে পরিণত হল। একেতো অপরিচিত একজনের পাশে ঘুমানো তার উপর নাক ডাকা এই দুই মিলিয়ে আমার সারারাত ঘুম হলনা। তারচেয়ে একাএকা স্বপ্ন দেখে ভয় পাওয়াই ভাল ছিল অন্তত নিজের বিছানায় এপাশ থেকে ওপাশ গড়াগড়ি করা যেত ইচ্ছামত। ভোরে ঘুমটা লাগছিল তাও ৮.৩০টার ক্লাস ধরতে ৭টার সময় উঠতে হল। দুপুরে বাসায় আসতে মন সায় দিলনা ওই নন-ব্রেক এফ এম এর কারণে। সন্ধ্যায় বাসায় গিয়ে শুনি এফ এম যে সকালে নাস্তা করে গেছে আর সারাদিন ফেরেনি। ওর রুমে গেলাম, ভালই গুছিয়েছে। টেবিলে সমরেসের ‘হারামির হাতবাক্স’ আধপড়া অবস্থায় পরে আছে। দেখে নিজের অজান্তেই মুখ দিয়ে ‘হারামি’ চলে এল।

রাত ৮টার দিকে জহির বাসায় ফিরল। এসেই শুরু করল তার বকবকানি। আমিও নিজেকে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছি, এছাড়াতো আর কিছু করার নাই। আগের রাত নির্ঘুমভাবে কাটায় আজকের রাতে তার বকবকানির মধ্যেও ঘুম চলে আসল। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুমের মাঝে মনেহল আমার পাশে কেউ যেন গরু জবাই করছে। আধঘুম আধজাগরনের মধ্যে মনেহল জবাই করার পর গরু যে গরররররররররর আওয়াজ করে সেই শব্দ শুনছি। ধরমর করে লাফ দিয়ে উঠে দেখি হনুমানটা নাক ডাকছে। আমার একবার ঘুম ভেঙ্গে গেলে আর ঘুম আসেনা। ওর দিকে তাকিয়ে দেখি কি নিশ্চিন্তেই না ঘুমুচ্ছে। ঘুমন্ত মানুষের মুখে একটা নিষ্পাপ আভা থাকে তা সে যত বড়ই পাপী হোকনা কেন। জহিরের চেহারায় সেটা আরও বেশি ফুটে উঠছে।
আমি এখন আস্তে আস্তে জহিরকে সহ্য করতে শুরু করছি।জহিরের কর্মকাণ্ডে এখন আমার গায়ে আর আগের মতো মরিচ লাগেনা। আজকে জহিরের সাথে আমার তৃতীয় রাত। আগের দুইরাত আমি সেই স্বপ্নটা দেখিনি। যথারীতি জহিরের বকবকানি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের মধ্যে বুকের মাঝে সেই পাথর চেপে বসল। জহিরের ধাক্কায় ঘুম ভাঙল।
-এই তুমি ঘুমের মধ্যে চাপা স্বরে আর্তনাদ করছিলে, স্বপ্ন দেখছ?
– হ্যাঁ।
-ভয় করছে?
আমি কোন জবাব দিলামনা। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, এই আমি ধরলাম। আর ভয় নাই। আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গিয়েও ছাড়ালাম না। মনেহল সে যা করছে তাই ঠিক। কি এক অজানা চাওয়ায় আমি আরও শক্ত করে তাকে ধরে তার বুকের সাথে লেপটে থাকলাম। আমার ভয়টা তখন অন্যরকম এক ভাল লাগায় পরিণত হল। ধীরে ধীরে সে আমাকে তার দিকে টেনে নিতে থাকল। সব কি হচ্ছে, আমার নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে নাই। আমি প্রাণপণে চাচ্ছি জহির নামের এই লোকটা আমার সাথে খারাপ কোন খেলা খেলুক যে খেলা আমাদের সমাজে পাপ বলে গণ্য। এই আমি যেন আমি না অন্য কেউ। আমার অনাবৃত দেহে জহিরের উষ্ণ দুখানি ঠোঁটের অবাধ বিচরণে আমার সারা দেহে এক স্বর্গীয় শিহরণ অনুভূত হল। আমি নিজেকে পুরোপুরি তার মাঝে সপে দিলাম। আমাদের দুজনের মুখেই অস্ফুট সুখের আওয়াজ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নাই তারপরেও সে কেমন করে জানি সব বুঝে যাচ্ছে আমি কি চাই তার কাছে। ভালবাসাময় এক তীব্র যন্ত্রণা সেদিন আমি উপলব্ধি করলাম।প্রচণ্ড ব্যথা তারপরেও মনের মধ্যে কোথায় জানি একটা তৃপ্তির সুখ।

সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর দেখি জহির আমার পাশে নেই। ওর সামনে যেতে খুব লজ্জা লাগছিল আবার ওরে দেখতে ও খুব ইচ্ছা করছিল। লাজশরমকে চাপা দিয়ে আমি ওর ঘরে গিয়ে দেখি সে নাই।টেবিলে পেইন কিলার আর একটা চিরকুট রাখা। চিরকুটে লিখা “তুমি ঘুমাচ্ছ দেখে ডাকিনি, ওষুধটি খেয়ে নিও” আমি আর রাতে আসব। সারাদিন যে আমার কিভাবে কাটল তার অপেক্ষা করতে করতে সেটা যে অপেক্ষা করছে সেই বুঝবে। মাত্র একদিন আগে যাকে আমার হনুমান মনেহত আজ তাকে একেবারে পেখম মেলা ময়ূর মনে হচ্ছে। আমি কি ওরে ভালবেসে ফেলছি?মাত্র একরাতের দৈহিক তৃপ্তিতেই প্রেম হয়ে গেল?প্রেম এত সোজা? এসবের কোন জবাব ই আমি খুঁজে পেলামনা। আমি শুধু জানি জহিরকে আমি দেখতে চাই, সবসময় আমার কাছে পেতে চাই।

সন্ধ্যায় জহির বাসায় এল।ও র ঘরে উকি দিয়ে দেখলাম বিছানায় বালিশে হেলান দিয়ে ‘হারামির হাতবাক্স’ বইটা পড়ছে। আমাকে খেয়ালই করলনা। এবারও আমার মুখ দিয়ে বের হল ‘হারামি’ তবে আগেরবার যার বই তাকে উদ্দেশ্য করে বলছিলাম আর এইবার বইটাকে উদ্দেশ্য করে বলছি। বইটা না থাকলে সে নিশ্চয় আমার কাছে আসত গল্প করার জন্য।

একমাস হল জহির একটা চাকরি পেয়েছে। বেতনও খারাপ না।আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে, কত রাত যে আমরা সুখ-সাগরে ভেসেছি তারপরেও কেউ কাউকে ভালবাসি কথাটি বলতে পারিনি। প্রতি ছুটির দিনে আমরা একসাথে ঘুরতে যাই। ঐদিনের পর হতে আমার সেই অসুখটাও আর আসেনি। সন্ধ্যায় জহিরের ঘরে গেলাম। গিয়ে দেখি ওর হাতে ওর মায়ের চিঠি, ওর মা ওর জন্য মেয়ে ঠিক করে রেখেছেন। সে গেলেই বিয়ের কথাবার্তা পাকা করবেন। জহির কি অবলীলায় ই না আমাকে বলল,

-তোমাকে কিন্তু আমার বিয়ের ৭দিন আগ থেকে থাকতে হবে।

একবারও সে বুঝলনা তার কথায় আমার ভেতরে যে কি হাহাকার হচ্ছে। আমি জানি জহিরকে কিছু বলা না বলা সমান কথা। সে এরকম সম্পর্ক কখনই মেনে নিতে পারবেনা কারণ জহিররা এমনই হয়। প্রকৃতির বুকে বসন্ত বারবার এলেও মানুষের জীবনে বসন্ত একবারই আসে।

জহিররা বসন্তের পাখি হয়ে আমাদের মতো শিমুলদের ডালে একবারই বসে..

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s