অন্য জীবন

মাঝে মাঝেই ভীষণ সাধ জাগে, ‘স’-এর সাথে প্রেম করি। ‘স’ আমার খুব ভালো একজন বন্ধু। এতোটাই ভালো যে, আমার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি ভালো একটি মানুষ যে, আমার ধরা-ছোঁয়ার চেয়েও অনেক বেশি গুণী এবং অনেক বেশি মেধাবী সে, আমার সাধ্যের চেয়েও অনেক বেশি পরোপকারী সে। সেই ‘স’, যে কি না আমি মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই বুঝে নেয়, আজ আমার মন খারাপ, আজ কিছু একটা হয়েছে। আমি কোন একটা সমস্যা তুলে ধরলে যেই ‘স’ মুহুর্তের মধ্যেই সমাধান বের করে দেয়। সেই ‘স’, যে আমার ভবিষ্যৎ চিন্তায় উতলা হয়ে আমায় প্রায়ই ধমকায়, “তুমি এতো অলস কেন? আজ থেকে এই এই করবা, এই এই পড়বা প্রতিদিন। এখনি শুরু করো, বসো টেবিলে এক্ষুণি”। আমি ভীষণ আলসে আবদারে শরীর মুচড়ে বলি, “আরে করবোই তো! তুমি খালি ধমকাও আমাকে। একটু পরেই পড়বো, এখন না, প্লীইইইজ!” ‘স’ চোখ রাঙ্গিয়ে তাকায়, আমার ফাঁকি দেয়ার ফন্দি বুঝতে পেরে। ধরা পড়ে গিয়ে বোকার মতোন হাসি আমি। যখন দীর্ঘদিনের ছুটিতে দীর্ঘ দীর্ঘ পথ দূরে দীর্ঘ দিনের অসাক্ষাতে থাকি আমরা, আর আত্মাভিমানী এই আমি ঠোঁট ফুলিয়ে বসে থাকি, “বন্ধুরা কেউ কোন কল/এসএমএস দেয় না” বলে, একমাত্র ‘স’-ই তখন সেই দীর্ঘ বাধা-মৌনতা ভেঙ্গে আমার খোঁজ নেয়, “হ্যালো! কি করো?”

অথচ, দেখেছি, ‘স’ কখনোই কোনরকম বিনিময় প্রত্যাশা করে না! আমার মতোন ছোট মন তার কিছুতেই নয়। ধরো, তার বাইরে যাবার ভীষণ দরকার, আমি আবদার জুড়লাম তার সাথে যেতে চাই বলে, শুরুতেই সে আমায় জিজ্ঞেস করবে, “ক্লাস-টাস নেই তো আবার! ক্লাস থাকলে যেতে হবে না”। অন্য কারো বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে তাকে সঙ্গ দিতে গিয়ে, এটা সে কিছুমাত্র সহ্য করবে না।
আবার ধরো, কোন একদিন, আমার কিচ্ছু খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না, এমনিতেই, নেহাত আলসেমীর জন্য; গল্প করতেই ভালো লাগছে, এক ফাঁকে ‘স’ বলে, “দাঁড়াও, একটু আসছি”, এবং মিনিট পাঁচেক পরই হাতে একটি বিস্কিটের প্যাকেট নিয়ে হাজির সে। হেসে বলি, “আরে বোকা! ক্ষিদে পেলে তো আমি নিজেই খেয়ে আসতাম!” ‘স’ ভারী গলায় বলে, “হাল্কা কিছু খেয়ে নাও, রাতে নইলে হঠাৎ পাওয়া ক্ষুধায় ঘুম ভেঙ্গে যাবে”। খুব গোপনে, সুখের একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলি আমি। আবার কখনো কখনো যখন অনেক দূরে, অনেক দূর্গমে, শখ মেটাতে, ঘুর বেড়াতে, কতোগুলো দিন কাটাতে যাই, আমার নিজের মা বাদে ‘স’-ই দ্বিতীয় মানুষ, যে ঐ অতদূর থেকেও আমার খোঁজ নেবে। মনে মনে ‘স’-কে নিজের অভিভাবক বলেই মেনে নিই আমি, যদিও আমরা শুধুই সমবয়েসী বন্ধু।

জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয় খুব; আচ্ছা, এতটা দায়িত্বশীল মানুষ হয় কি করে? এই আমাকেই দেখো না, নিজের স্বার্থ বুঝে পেলে আর কিচ্ছুটি খেয়াল করি না। মাঝে মাঝে শুধিয়েও বসি, “আচ্ছা! তুমি আমার সাথে মেশো কেন?” আওয়াজ তুলে হেসে ‘স’ বলে, “কঠিন প্রশ্ন! আসলেই তো! কেন মিশি তোমার সাথে? আচ্ছা যাও, কাল থেকে আর মিশবো না তোমার সাথে!” সেই কাল আর কোনদিন আসে না।
অনেকদিন ভেবে দেখেছি, ‘স’ এর জায়গায় আমি হলে কবেই এমন সঙ্গ ছেড়ে দিতাম! ‘স’ এর ছেলেমানুষী দেখে কতোদিন হেসেই খুন হয়েছি, একে ওকে ডেকে ডেকে সেসব বলেছি, অথচ, কখনোই তেমন করে রাগাতে পারি নি ওকে। ওর জায়গায় আমি হলে কি কি করে বসতাম, সেসব কথা ভাবতেও ভয় হয়। এমন ভালো একটি বন্ধু আছে আমার। অথচ এই আমি, কামুক-স্বার্থান্ধ এই আমি, মাঝে মাঝেই ‘স’ এর প্রেমে পড়ে যাই। মাঝে মাঝে ভীষণ স্বার্থপরের মতো বলতে ইচ্ছে হয়; হ্যাঁ, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে, সব্বাইকে শুনিয়ে, ‘স’-কে বলতে ইচ্ছে হয়, “আমায় ভালোবাসো ‘স’! আমার সাথে গোটা জীবন কাটিয়ে দাও! সামনের যতগুলো দিন আমি বেঁচে থাকবো, তুমি এমনি সাথে থেকো আমার! আমার ভয় লাগে ভীষণ, একলা জীবন কাটাতে হবে ভাবলে!” জানি, ‘স’-এর জন্য থাকবে একটি সুন্দর জীবন। তার জন্য অপেক্ষা করে আছে অনেকগুলো স্বপ্ন, অনেক ফুল, অনেক ফসল, অনেক প্রেম ও অনেক ভবিষ্যত। অথচ, এই আমার, এই স্বার্থপর মনের ইচ্ছে হতে থাকে, ‘স’-কে মিনতি করি, ‘স’-কে পথ ভুলাই, ‘স’-কে নিজের অর্থহীন জীবনের সাথে জড়াই, যেখানে নিশ্চিত জানি যে ‘স’ আমার মতোন নয়! মাঝে মাঝে তাই খুব কষ্ট হয়, ভীষণ লোভী মনে হয় নিজেকে, মনে মনে ‘স’-কে বলি, “তুমি ভীষণ বোকা! তুমি ভুল মানুষকে বিশ্বাস করছো! তুমি ভুল মানুষকে বন্ধু ভাবছো! একটি ভীষণ স্বার্থপর, ভীষণ কামুককে তুমি অযথাই বন্ধু ভেবে, বিশ্বাস করে, নিজের ক্ষতি করছো!”

প্রায়ই ভাবি, আমার মতো মানুষের তো উচিৎ, ‘স’-এর মতো এমন একটি ভালো মানুষের জীবনে নিজের কুচ্ছিৎ কালো ছায়া পড়তে না দেয়া। মাঝে মাঝেই ভাবি, আর কখনো ‘স’ এর সাথে যোগাযোগ করবো না। ‘স’, ভীষণ বন্ধুবৎসল-হাস্যোজ্জ্বল ‘স’, নিজেই বারবার আসতে থাকে, একা মরতে দিতে চায় না আমায়। ভীষণ ভয় হয়, যদি কখনো সে জানতে পারে, আমার একটি কুৎসিত মনের কথা, আমার একটি অযৌক্তিক, অনৈতিক আব্দারের কথা, সে কি ভীষণ আহত হয়ে তীব্র ঘৃণা করবে আমায়? বিশ্বাস করো ‘স’, নিজের অনুভূতিগুলো বড্ড বেয়াড়া বলেই শুধুমাত্র মাঝে মাঝে বন্ধুত্বের চরমতম অবমাননা করে প্রেমে পড়ে যাই আমি। সজ্ঞানে, স্ব-ইচ্ছায় তোমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছে নেই আমার, অন্ততঃ অতটা বেঈমান আমি নই। তুমি সবসময় ভালো থেকো ‘স’, তোমার হাসি, কথা আর স্বচ্ছ মনের আলোতে মাতিয়ে রেখো আশেপাশের সবাইকে। যদি কখনো ঠিক তোমার মতো কাউকে পাই, একটা জীবন তার সাথে কাটাতে দ্বিতীয়বার ভাববো না আমি। ঠিক তোমার মতোই কোন একজনের প্রত্যাশায় থাকবো আমি। গল্প-উপন্যাসের মতোন অতটা প্রেম বা অতটা কাম না হলেও চলবে, শুধুমাত্র আমৃত্যু তার সঙ্গ পেলেই ধন্য হয়ে যাবো। অথবা, অন্য একটি জীবনের জন্য, অন্য একটি জন্মের জন্য অপেক্ষা করবো আমি। ধর্মে অবিশ্বাসী এই আমি ঈশ্বরের কাছে প্রাণপণ প্রার্থনা করবো, যেন সে জীবনে, সে জন্মে তোমার সাথেই কাটিয়ে দিতে পারি সবটুকু সময়।

মূল লেখকঃ উইন্ডি স্ট্রম।

One thought on “অন্য জীবন

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s