অনুপমঃ রাজ

সেকেন্ড ইয়ারের রেজাল্ট ভালো হয় নাই। সেকেন্ড ক্লাস টুয়েলভথ। থার্ড ইয়ারে চেষ্টা করলাম গ্যাপটা কমাতে। মাথা পুরাই ফাঁকা। কোন চাপ নাই। কোন ফিলিংস নাই। ভালোবাসাহীন অনুভূতিহীন পুরো এক বছর। বছর শেষে রেজাল্ট দেখে আনন্দে কান্না পেলো। ওভালঅল ফার্স্ট ক্লাস পেতে হলে আমাকে আর মাত্র ত্রিশ মার্ক বেশী তুলতে হবে ফোর্থ ইয়ারে। মনের ভিতর সুখের কুরকুরানি। ফেসবুকে প্রতিদিন ছবি আপলোড করছি। বন্ধু কতজন! ৩১৩ জন। তাতেই যে কটা লাইক কমেন্টস পেতাম তাতেই মন ভরে যেত। এত ছবি আপলোড করতাম যে অনেকেই বিরক্ত হত। ক্যানাডা প্রবাসী এক ফেসবুক ফ্রেন্ড বলত, কবে যে দেখব তুমি টয়লেটের কমোডে বসে ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করছ। আমি কিছুটা কিউট তো ছিলাম। নিজেকে সুন্দর ভাবতাম। চেহারা ভেঙে যাওয়ার আগে যেটুকু ছিলো তা নিয়ে ঢের গর্ব করা যেত। ফোর্থ ইয়াররে মাঝামাঝি সময় আমি প্রেমে পড়লাম। ইচ্ছা করে পড়তে চাইনি। অনিচ্ছায় পড়েছিলাম।

রাজের (ছদ্মনাম) সাথেও আমার মিগ৩৩ তে পরিচয়। হায়রে মিগ তুই আমাকে দিয়েছিস যত নিয়েছিস তার থেকে ঢেড় বেশী। রাজ আমার জীবনে এসেছিলো বন্ধুত্বের আহবান নিয়ে। আমি তাকে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলাম আমার পক্ষে আর কাউকে ভালোবাসা সম্ভব না। আমি কাউকে কেন জানিনা আর ভালোবাসতে পারিনা। সত্যি আমি সৌম্যের পরে আজ পর্যন্ত সত্যিকারে কাউকে ভালোবাসতে পারিনি। ভালোবাসার যে চেষ্টা করেছি, করছি, মেঘকে, খোকার মা কে সব কিছুর ভিতর একটা শুন্যতা পাখা মেলে থাকে সারাক্ষণ। এই সেদিন খোকার মা আমাকে বলল, সত্যি করে বলত, তুমি জীবনে কতবার ছ্যাকা খেয়েছ? তোমার ব্যবহার এত কাঠপুতুলের মত কেন। ভালোবাসার ব্যাপারে তুমি এত নিরাসক্ত কেন!

আমি খোকার মাকে হলফ করে বলেছি, আমি এই জীবনে কখনো কোন মেয়ের কাছে ছ্যাঁকা খাইনি। সত্যিই কথাই বলেছি তাকে। রাজ আমাকে বলল, যে সে আমার সাথে প্রেম করতে চায় না। বন্ধুত্ব করতে চায়। নির্মল বন্ধুত্ব। কিছুদিন আগে তার ব্রেকাপ হয়েছে। একজন ভালো মনের বন্ধু খুঁজছে সে। যার সাথে সে তার ব্যাথা কষ্টের কথাগুলো শেয়ার করতে পারবে। ব্রেকাপের বেদনা আমার অজানা নয়। আমি রাজের জন্য বেদনা অনুভব করলাম। তাকে স্বেচ্ছায় সুযোগ দিলাম আমার মাথায় ঢোকার। তার কষ্টের কথা শুনে শান্তনা দিতে লাগলাম। যে কথাগুলোকে আমার কাছে এখন ন্যাকা ন্যাকা মনে হয় সেই টাইপের কথা তখন আমার মুখ দিয়ে বের হত। রাজ কৌশলে আমার ভালোবাসার চারাগাছে পানি দেয়া শুরু করেছিলো। আমি বুঝিনি। বুঝতে পারলাম যখন ভালোবাসার গাছে প্রেমের কুঁড়ি ফুটতে শুরু করেছে। ডিশিসান নিতে পারছিলাম না। কি করব। রাজ তখন মৌনব্রত পালন করছে। কিছুই বলে না। সে আমাকে জীবনের থেকে বেশী ভালোবাসে। এখন আমি ভালোবাসব কিনা সেটা আমার ব্যাপার। হলে থাকি। হলের চারতলার ছাদে পায়চারি করতে করতে আমার পা ব্যাথা হয়ে যেত। আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। অবশেষে এই সিদ্ধান্তে এলাম, আরেকবার চেষ্টা করে দেখা যাক।

ভালোবাসার পানসি নয় স্পীড বোট ছোটালাম। এখন আমি ভালোবাসায় অনেক দক্ষ। পাকামো ন্যাকামোতেও কম যাই না। তবে একথা সত্যি যে আমি রাজকে সত্যিকারের ভালোবেসে ফেললাম। পড়াশোনায় আবার লালবাতি জ্বলার উপক্রম। ক্লাসে টিচারদের বকা খাই। তাতেও কাজ হয় না। ফোর্থ ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার পর আমি ঢাকা চলে আসি। রাজের বাসায় যাই এক ভোর বেলা। শরীরে সারা রাতের জার্নির ক্লান্তি। বাসাটা কোথায় আমার ঠিক মনে নেই। খিলগাঁও-বনানীর এদিকে কোথাও ছিলো। রাজের বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছিলো রাজ। ঘুম ভাঙলো শারীরিক যন্ত্রণায়। আমার দেহে ঢুকেছে আরেকজন। আমি বাঁধা দেবার অবস্থায় ছিলাম না। বাঁধা দেবার ইচ্ছাও ছিলো না। ভালোবাসার পরিনতি সেক্স । এতে বাঁধা দেবার কি আছে। আমরা দুজন দুজনের স্ট্যামিনা নিয়ে লড়ে গেলাম আদিম যুদ্ধে কয়েকবার। বিকেলে ঘুরতে গেলাম গুলশানে। হাত ধরাধরি করে ঘুরলাম। রোমান্স ফিলিংস যারা বোঝ তারা নিশ্চয়ই জানো ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে ঘোরার স্বর্গীয় আনন্দ। তার এক পরিচিত বন্ধুর বাসায় গিয়ে আড্ডা দিলাম। ছেলেটা একটু ফ্যাটি। কিন্তু সুদর্শন।

রাত আমাদের আরেকটি আদিম পরিবেশের সুযোগ দিলো। ভালোবাসার মধুবনে গুঞ্জরণ তুললাম দুজন মৌমাছি হয়ে। সকালে সে অফিসে গেলো। আমি ঘুরতে বের হলাম। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে হাঁটছি। চতুর্থবারের মত ঢাকা এলাম। তৃতীয়বার ঢাকা এসেছিলাম সৌম্যের টানে। দীর্ঘদিন সৌম্যের কোন খবর জানিনা। ফোন নাম্বার আজো আছে আমার মোবাইলে। ডায়াল করলাম। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিলাম না। রাজকে ছাঁপিয়ে গেলো সৌম্য আজ। সৌম্য ফোন ধরে হ্যালো বলল। আমার সাড়া শরীর শিহরিত হলো এক পুরোনো আবেগে। কেমন আছো কি করো কথা বলার পর সে বলল, কি চাই? ফোন করেছ কেন।

– কিছু চাই না। যা হারিয়েছি তা ফিরে পাবার আশা করার মত মুর্খ আমি নই। আমি শুধু একবার তোমার দেখা পেতে চাই।
– দেখা করতে পারব না। তুমিও এখনও এইসব নিয়ে আছো। একটা কথা বলি তোমাকে, এখন যে ছেলেটার সাথে রিলেশানে গেছ, সে কিন্তু ভালো না।
আমি চুপ করে রইলাম। জিজ্ঞেস করতে পারলাম না, আমি না হয় এই জীবনে আছি। তুমি কেন আছো! আর তোমার নেটওয়ার্ক এত শক্ত কেন! আমি কার সাথে কোথায় যাই তার খবর পেয়ে যাও।
– আচ্ছা একটা কথা বলত। তুমি তো আমার থেকে সুন্দর। টল। আমার মধ্যে তুমি কি দেখেছ যার জন্য আমার পিছে লেগে আছে?
– আমি মোটেও তোমার পিছু লেগে নেই সৌম্য। আমি জাস্ট তোমাকে দেখতে চাই। আমি সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বসে আছি। তুমি এসে এই নাম্বারে ফোন দাও। আমি অপেক্ষা করছি।
আমি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অভুক্ত অবস্থায় সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বসে রইলাম। সৌম্যর মোবাইল সুইচ অফ। তবুও আশা করে আমি বসে থাকলাম সারাটি দিন। সারাদিনে কত লোক এলো গেলো। আমি চাতক পাখির মত চেয়ে রইলাম। আসেনি সে।

সন্ধ্যায় রাজের সাথে দেখা হলো। সেই ফোন করে এলো এখানে। সারাদিনে তাকে ফোন দেইনি তাকে। কালো ভূড়িমোটা ছেলেটার দিকে চোখ মেলে তাকালাম। এও কি ভালোবাসার মূল্য দিতে পারবে। রাজের চেহারা আমার আজ আর মনে পড়েনা। তার সেই সময়ে দেয়া ডায়ালগটা আমার আজো মনে পড়ে, “এমন করে তাকিয়ো না জান। তোমার চোখের দিকে তাকালে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।” কারো চোখের দিকে তাকালে কেন মরে যেতে ইচ্ছে করে। ভালোবাসার জন্য! কিন্তু ভালোবাসা তো ছিলোনা তার কামনার আগুনে।

রাতে সে জৈবিক তাড়নায় হাত বাড়ালো আমার দিকে। স্বভাবতই আজ বাধা দিলাম। মন ভালো নেই। সে জানতে চাইলো কি হয়েছে। আমি সৌম্যের বিষয় তাকে আগেও বলেছি। আজকের ঘটনাটা বললাম। রাজ বলল, দেখ এসব নিয়ে কষ্ট পাওয়া বৃথা। তুমি যে সৌম্যের জন্য কষ্ট পাচ্ছ সে তো কিছুদিন পরপরই পার্টনার চেঞ্জ করে। এই ওয়ার্ল্ডে তুমি ভালোবাসা পাবেনা।

-তুমি আমাকে ভালোবাসো না?

রাজ কিছুটা ইতঃস্তত করে বলল, দেখ আমি এসব ভালোবাসা টাসা বিশ্বাস করিনা। আমি বন্ধুত্বে বিশ্বাস করি। দুজনের মনের মিল থাকলে সেক্স হতে পারে।
-তুমি আমাকে ভালোবাসোনি?
-না।
-তবে কি আমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করেছ?
-না। তুমি আমাকে ভূল বুঝেছ।
-ভূল বোঝার বয়স আমার পেরিয়ে গেছে। তোমার সবকথা আমার চোখের সামনে পরিষ্কার ভাসে। আমি স্পষ্ট বলতে পারি তুমি কবে আমাকে কি বলেছ।
-এসব বাদ দাও শুভ্র। আমার দ্বারা এসব ভালোবাসা হবে না। ভালোবাসার সম্পর্ক করতে চাইলে তুমি আমার বন্ধুর সাথে করতে পারো। ও আবার এই সব ভালোবাসা টাসা বিশ্বাস করে। তুমি চাইলে আমি তোমাদের দুজনের ঘটকালি করতে পারি।

আমি অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে রইলাম কালো ছেলেটির কালো মুখের দিকে। জগতের সব থেকে কুৎসিত মুখ বলে মনে হচ্ছে। কাল রাতে ভালোবাসার বিনিময়ে সে দৈহিক সম্পর্ক করল আর এখন বন্ধুর ভোগে পাঠানোর জন্য ড্রামাবাজি। সোজা প্রেমিক থেকে প্রোস্টিটিউটে নামিয়ে আনার চেষ্টা। আমার ইগো তখনো অনেক বেশী। আমি রাগ করে তার বাসা থেকে সেই রাতে বেরিয়ে গেলাম। সে বাঁধা দিলো না। কল্যাণপুরে এসে বাস ধরার আগে রাজের নাম্বার, সৌম্যের নাম্বার মুছে ফেললাম মোবাইল থেকে। তাদের কেউই আর কখনো আমার সাথে যোগাযোগ করেনি।

ভালোবাসার গুষ্টি কিলাই। তবুও আমি আরো কয়েকবার ভালোবাসার অভিযানে নেমেছিলাম। আমি সারাজীবন ভূল মানুষের ভূল দরজায় কড়া নেড়েছি বারংবার। ভালোবাসা আমার দরজায় এখনো মাঝে মাঝে কড়া নাড়ে। আমি দরজা খুলি না। এক জীবনে মানুষের সব চাওয়া পূর্ণ হয় না। তবে একথাও ঠিক, প্রেমের মরা জলে ডোবে না। আমি বারবার প্রেম সাগরে ভেসে উঠেছি একটু প্রেমের পরশের আশায়।

আমার সার্টিফিকেটগুলোর মধ্যে একটাতে সেকেন্ড ক্লাস আছে। সেকেন্ড ক্লাস ফার্স্ট। অনার্সের সার্টিফিকেট। ৯ মার্কের জন্য আমি অভারঅল ফার্স্টক্লাস পাইনি। আমার লেখা যদি কেউ পড় তবে তাকে আমি একটা উপদেশ দেব। বর্তমানকে কখনো উপেক্ষা করোনা বন্ধু। উপেক্ষা করলে সে বর্তমানে যা দেবে ভবিষ্যতে তার থেকে কয়েকগুন কেড়ে নেবে সে।

3 thoughts on “অনুপমঃ রাজ

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s