শুভ্রকথাঃ এক রঙিলা জগতে।

অঝোর ধারায় আকাশ কাঁদছে। আকাশের কান্না ভেঙে পড়েছে নদীর উপর। সাদা কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে আঁছে। শুভ্র এক দৌঁড়ে সমিলের চালের নিচে আশ্র্য় নিল। নদীতে হালকা ঢেউ। বৃষ্টির ফোঁটা গুলো টপটপ করে পড়ছে ঢেউয়ের ডগায়। শুভ্র নদীর দিকে মুখ করে বসল। সে কিছুটা প্রকৃতি প্রেমিক। উদাস ভাব ভর করে তার উপর। মা ভাবে তার ছেলেটার মাথায় সিট আছে। না হলে এই বয়সের ছেলে কেন এরকম হবে। কিন্তু লেখাপড়ায় তো ভাল। অনেক বছর ধরেই সে স্কুলের পরিক্ষায় পুরস্কার পেয়ে আসছে। পাড়ার সবাই তার ছেলের প্রশংসা করে। কেউ কখনো তার ছেলেদের নিয়ে একটা বাজে কথা বলতে পারবে না। ছেলেদের নিয়ে তার অনেক গর্ব।

শুভ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়েছে। এক রঙীন জীবনে ঢুকে গেছে। সে অনেকটা অন্তর্মুখী স্বভাবের। তাই সেভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারে না। ছুটিতে বাড়ী এসেছে। খুলনা জেলার ছেলে বড় হয়েছে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা এক নদীর মোহনায়। এই নদী শেষ হয়েছে পশুর নদীতে। পশুর নদী গিয়ে মিশেছে সাগরে। পশুর নদীর আরেক মাথা রুপসায়। রুপসার তীরে খুলনা শহর, সাজানো গোছানো ছোট্ট একটা নিরিবিলি শহর। নদীর পাশেই কেটেছে শুভ্র’র শৈশব কৈশোর। যৌবনে পা দিয়েও তাই সে নদীর প্রতি দূর্নিবার আকর্ষণ বোধ করে। বাড়ী এলেই তাই সে বিকেলের আলো ঠান্ডা হওয়ার সাথে সাথে ছুটে যায় নদীর কাছে।

dur pahare

ঢেউ গোনা। ওপারের আকাশে মেঘেদের রঙের খেলা দেখা। নৌকা চলাচল। সন্ধ্যা আকাশে কাকেদের ঘরে ফেরা। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের সুর। সব কিছু তাকে পাগল করে রাখে এক অজানা বন্ধনে। স্কুলের বন্ধুদের কাউকে পেলেই মন খুলে গল্প শুরু করে। সে গল্পের কোন আগামাথা থাকে। একেক জন যেন জ্ঞানের জাহাজ। সব কিছুই জানে এমনটি ভাব। জ্ঞান-বিজ্ঞান-ধর্ম-সমাজ-রাজনীতি কি থাকেনা তাদের আলোচনায়। বন্ধুরা কেউ না থাকলে সে মোবাইলে ডুব মারে। মা বলে কি আছে তোর মোবাইলের ভিতর। সারাদিন এত কি টিপিস। আম্মাকে সে কিভাবে বোঝাবে এই মোবাইল তার সামনে খুলে দিয়েছে বন্ধুত্বের এক নতুন জগৎ। হাজার হাজার বন্ধু খুঁজে পাওয়া যায়। তাদের সাথে মন খুলে সব কথা বলা যায়। যদিও তার এখন খুব বন্ধু নেই। অল্প কজন বন্ধু। তাদের সাথেই সারাদিন পুটুর পুটুর করে। তার স্কুলফ্রেন্ড তরুনের কাছ থেকে শিখে নিয়েছে কিভাবে মিগ৩৩ দিয়ে চ্যাট করতে হয়। সে তার দিনের বেশীরভাগ সময় মিগ৩৩ তেই পড়ে থাকে। সুদানী এক বন্ধু জুটেছে। ওমর আলকাতিব। তার সাথেই সে চ্যাট করে।

শুভ্র আজ অনেক দিন পর ডায়েরী লিখতে বসেছে। ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দ ছাড়া চারপাশে রাতের সুনসান নিরবতা। ঝিঁঝিপোকারা আজ হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। শুভ্র হাত বাড়িয়ে মোবাইল টা তেনে নিল বালিশের তলায়। সে সব ধরণের গানই শোনে। একেক সময় একেক ধরনের গান শোনে। যখন যেমন মুড আসে। আজ রবীন্দ্র শুনতে ইচ্ছে করছে। মোবাইলের স্পিকারে হেমন্ত গেয়ে উঠল, পুরোনো সেই দিনের কথা ভূলবি কিরে হায়, ও সে চোখের দেখা, প্রাণের কথা সে কি ভোলা যায়। শুভ্র ভূলতে চায় না তার ফেলে যাওয়া দিনকে। তাই সে প্রাণের মাঝে ধরে রাখতে চায় সুখ-দূখের অনুভূতি। প্রাণ জুড়ানো মুহুর্তগুলো আজ থেকে কয়েক দশক পড়ে বারান্দায় ইজি চেয়ারে দোল খেতে খেতে সে খুজ়ে পাবে ডায়েরীর পাতায়। বাঁজিয়ে বাঁশি হেমন্ত বাবু তখনো এমনি করে বকুলের তলায় গান গাইবে যান্ত্রিক কন্ঠে। সখা আবার কি দেখা হবে, আবারো কি প্রাণের মাঝে তোমাকে এভাবে অনুভব করতে পারব!

শুভ্র’র আজকাল কি যেন হয়েছে। তার মাথার ভিতর সৌম্য ছাড়া আর কিছু নেই। সারাদিন সৌম্যের সাথে চ্যাট- কথা বলা এসব ছাড়া সে যেন কিছু বুঝতে চায় না। এক পাগলা স্রোত আজ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে দূর সমুদ্রে। যেখানে গাংচিলেরা নীল আকাশের নীচে উড়ুক্কু মাছেদের সাথে খেলা করে। আজ সে খুব সাধারণ বিষয় নিয়ে লিখছে। আজ সৌম্য’র সাথে সে একটানা দুই ঘন্টা কথা বলেছে। এখন পর্যন্ত সে ফোনে এতক্ষণ কারো সাথে কথা বলেনি। ভেবেছিল মনের মাধুরী মিশিয়ে অনেক কথা লিখবে। ডায়েরীর পাতা ভরে যাবে। মনের ভিতর কথার পাহাড়। লিখে ফুরোতে পারবে না। কিন্তু লিখতে বসে কোন শব্দ খুঁজ়ে পাচ্ছে না। ভাষারা কি আজ নির্বাক হয়ে গেল। অনেকক্ষন ধরে লিখল, আজ সৌম্য’র সাথে মোবাইলে ২ ঘন্টা কথা হল। এটাই আমার জীবনে কারো সাথে ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা। সে ডায়েরী বন্ধ করে শুয়ে পড়ল।

বোকা ছেলে! যৌবনের আবেগে সে অন্ধ ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুটে চলেছে। সে যদি জানত কয়েক বছর পর সে এই ডায়েরীটা খুঁজে পাবে আলমারির কাগজের ভীড়ে। ডায়রীটা তার আগুনে জ্বালিয়ে দিতে ইচ্ছে করবে, তাহলে কি এভাবে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারে। ভাব দেখে মনে হয় ভালবাসার মানুষকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে আছে।

সৌম্য’র প্রতি শুভ্র’র এই টানের অবশ্য একটা কারণ আছে। সে ইন্ট্রোভার্ট ধরণের ছেলে। স্বভাবত লাজুক বলে অপরিচিত কারো সাথে মিশতে পারে না। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। বাবা মা সংসারের হাজার ঝামেলায় ডুবে থাকেন। সন্তানকে দুবেলা খাইয়ে পড়িয়ে লেখা পড়া শিখাচ্ছেন এটাই অনেক। তারা তো আর সিনেমার মত সন্তানের কপালে চুমু খেয়ে আদর করতে পারেন না। তাই সৌম্য যখন তার খুঁটিনাটি সব গল্প শুনত, তাকে গুরুত্ব দিত, সে চ্যাট থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে অভিমান করত। শুভ্র’র মন দুর্বল হয়ে গেল। বাবা মায়ের ভালবাসা সেতো ভালবাসা। কিন্তু বাইরের মানুষের ভালবাসা যা ঠিক বন্ধুত্ব নয়, অন্য রকম কিছু তা পেয়ে শুভ্র মজে গেল এক রঙিলা জগতে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s