বাংলা উপন্যাসঃ সম ভালোবাসা ৩য় পর্ব

সাদা লিলেনের হাফশার্ট আর খাকী হাফ প্যান্ট পরা জন ট্রাংকটার উপর বসে পড়ল। মাথায় চারপাশে বারান্দাওয়ালা গোল টুপি। সে হাল ছেড়ে দিল না। নেটিভ বাঙালীগুলোকে এক্সিউজ মি এক্সিউজ মি বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। কিন্তু আর কেউ তার কাছে এল না। সবাই কেমন যেন ভয়ে দূরে সরে যেত লাগল। ডাঙায় এদিকটায় ছোট খাট হাট বসে গেছে। প্রায় সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত। সেই মানুষগুলোকে পাশ কাটিয়ে, ভিড় ঠেলে একটা তের চৌদ্দ বছরের ছেলে তার দিকে এগিয়ে এল। জনকে নমস্কার করল। এই হিন্দুরীতির সাথে জনের এরি মধ্যে পরিচয় হয়েছে। বাচ্চা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে সে ঘাড় নাড়াল। 

–      ইউ জনাব সাহেব?

ছেলেটার ইংরেজী উচ্চারণ যথেস্ট আঞ্চলিক। টানটাও অচেনা। কিন্তু তার খুব ভাল লাগল। এতগুলো বড় মানুষ যখন কেউ ইংরেজী বুঝল না, আর এই পিচ্চি একটা নেটিভ ছেলে ইংরেজী বলছে। তার কান জুড়িয়ে গেল। যদিও তার নাম বলছে কিনা বুঝতে পারল না। ছেলেটা হয়ত জন বলতেই চাইছে। আর সাদা চামড়ার মানুষদের নেটিভ’রা সাহেব বলে সেটা জন ভালই জানে। জন গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল।

–      ইয়েস আই এম জন হলম্যার।

প্রথম পরিচয়ের রীতিতে হ্যান্ডশেক করার জন্য জন হাতটা বাড়িয়ে দিল। ছেলেটা কিন্তু হাত বাড়াল না। হয়তো সাহেবদের হাত ধরার রীতি নেই এখানে।

–      আই পাঁচু। আই আন্ডারস্টান্ড ইংলিশ বাট লিটিল টেল। টমসন সাহেব সেন্ড আই। টেক ইউ। কাম মি।

বলেই সে পথের দিকে হাত দিয়ে ইশারা করল। ছেলেটা কি বলতে চাইছে জন পরিষ্কার বুঝতে না পারলেও এটা বুঝতে পারল যে টমসন সাহেব তাকে নিয়ে যেতে ছেলেটাকে পাঠিয়েছেন। সে ছেলেটার দেখানো পথে হাঁটা শুরু করল। ঘাটের এই পাশটায় ছোট একটা নৌকা বাঁধা। পাঁচু লাফ দিয়ে নৌকায় উঠল। জন শুনেছিল ঘাটে তার জন্য গাড়ী পাঠানো হবে। কিন্তু আবার নৌকা কেন! আর এত ছোট নৌকায় উঠতে তার ভয় লাগছিল। ছেলেটা বারবার তাকে হাতের ইশারায় নৌকায় ওঠার জন্য আহবান করছে। সে ভয়ে ভয়ে নৌকায় উঠল। ছোট ডিঙি নৌকা। ভয়ানক দুলে উঠল। জন অজান্তেই চিৎকার করে উঠল। পাড়ে দাঁড়াল মানুষগুলো মজা দেখতে লাগল দূর থেকে আড়চোখে। সাবেবদের এরা বেজায় ভয় পায়। সাহেব মানে হল শয়তান। পাচু সাহেবের কান্ড দেখে একবার হেসেই ফেলল। তারপর অভিনয় করে সাহেবকে দেখিয়ে বলল, “নো নড়াচড়া। সিট।” জন দুপাশে ধরে স্ট্যাচুর মত বসে থাকল।

পাঁচু বৈঠা বেয়ে নৌকাটাকে বেয়ে সামনে চলল। জোয়ারের যে একটা টান আছে এবার বোঝা গেল। নৌকাটা তিরিতির করে এগিয়ে যেতে লাগল। অল্পসময়ের ভিতরেই জন ধাতস্থ হয়ে গেল। এখন আর শক্ত করে নৌকাটাকে ধরে থাকতে হচ্ছে না। নদীটার দুপাশে বড়বড় গাছ। গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্য্যরশ্মি নেমে এসেছে নদীর বুকে। বাতাসে গঙ্গাফড়িং ভাসছে। তাদের ডানায় রোদ ঝিকমিক করছে। জনের ভাল লাগছে প্রকৃতি। কিন্তু গরমটা যেন একটু বেশী। পাচু নৌকা বেয়েই যাচ্ছে একমনে। ছেলেটার গা খালি। পরণে একটা হাফপ্যান্ট। সাইজ দেখে মনে হয় ওর থেকে দুই সাইজ বড় হবে প্যান্টটার। গুনগুন করে কি একটা গাইছে। মানে বোঝা জনের কথা নয়। কিন্তু এরকম পরিবেশের সাথে বেশ মানিয়ে যাচ্ছে সুরটা। এদেশের মানুষের জীবন মনে হয় নদী কেন্দ্রিক। নদীর পাড়ে অনেক বাড়ীঘর দেখা যাচ্ছে। শাড়ী-পড়া মেয়েরা কেউ কলস ভরে পানি নিয়ে যাচ্ছে, কেউবা বুক পানিতে দাঁড়িয়ে স্নান করছে। সাদা শাড়ী পরা পুরুষেরাও আছে কোথাও। মেয়েরা যে লম্বা একপ্রস্থ কাপড় পড়ে সেটাকে নেটিভরা শাড়ী বলে আর পুরুষরা সেটাকে ধুতি বলে। পুরুষেরা অবশ্য মেয়েদের মত সারা গা ঢেকে রাখে না। কোমরের নিচে পেচিয়ে রাখে। উর্ধাঙ্গ খালি থাকে।

 

একটা ছোট ঘাটে পাচু নৌকা ভেড়াল। পাড়ে ঘোড়ার গাড়ী দাঁড়িয়ে ছিল। ঘোড়ার গাড়ীর কোচয়ান আভূমি নত হয়ে তাকে সালাম করল। ঘোড়ার গাড়ীটা তাকে গন্তব্যে নামিয়ে দিল। লাল রঙের দোতলা বিল্ডিং । এটাই জনের নতুন নিবাস। পাঁচু টানাটানি করে তার জিনিসগুলোকে উপরের কামরায় দিয়ে গেল। লম্বা দারোয়ান টাইপের লোক ওকে সাহায্য করছিল। ভয়ে ভয়ে তার কাছে এসে সালাম দিয়ে গেল। খবর পেয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে টমসন সাহেব এলেন। বললেন, ইয়াং ম্যান, নো টেনশান। একবার এসে গেছ, আগামীকাল থেকে দেখবে ভাললাগা শুরু হয়ে গেছে। যদিও এই জায়গাটা ইংল্যান্ডের মতন সুন্দর না। সাক্ষাত নরক বলা চলে। যাই হোক, বাবুর্চী আছে। আশা করি তোমার কোন সমস্যা হবে না। আমি আজ একটু ব্যস্ত আছি। আগামী তুমি আমার ওখানে খাবে। তখন সব কথা হবে। আর কথা না বাড়িয়ে টমসন সাহেব ঘোড়া ছুটিয়ে বের হয়ে গেলেন।

One thought on “বাংলা উপন্যাসঃ সম ভালোবাসা ৩য় পর্ব

  1. চমৎকার লেখার হাত আপনার। আরো লেখেন। পুরোটা চাই একবারে।

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s