আমার কিছু কথা – ঝড়ো বাতাসের লেখা

সমকামীদের নিয়ে অনেকের অনেক রকম অভিযোগ। তারা সেক্সফ্রিক, তারা সঙ্গী পালটায়, তাদের সম্পর্ক টেকে না ইত্যাদি ইত্যাদি। অভিযোগগুলো একতরফাভাবে সমকামীদের দিকে তাক করা কেন বুঝতে পারি না আমি, কারণ এর সব ক’টা দোষ বিষমকামীদের মধ্যেও বেশ ভালোভাবেই বর্তমান। আর এর সবগুলো অভিযোগই যে খুব যুক্তিযুক্ত, তাও কিন্তু না। একটা একটা করে বলছি।

প্রথমতঃ অনেকের অভিযোগ, সমকামীরা শুধু শরীর খোঁজে, সুন্দর খোঁজে, মনের গুরুত্ব দেয় না। আমি বলি, মন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে শরীর জিনিসটা যদি গৌণই হতো তাহলে তো মেয়েদের সাথেই প্রেম করতে পারতাম, শুধু শুধু ছেলে খোঁজার দরকারটা কি ছিলো? প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে শারীরিক সৌন্দর্য্যও কিছুমাত্র কম গুরুত্বপূর্ণ না। বিয়ে করতে গেলেও অভিভাবক থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই সুন্দরী পাত্রী খোঁজে, লম্বা-চওড়া পাত্র খোঁজে। দেহটাকে গৌণ ভাবার কোনই কারণ নেই। যত মহান মহান প্রেম কাহিণী আমরা পড়ি, তার সবক’টার নায়ক-নায়িকারাই হয় দেবদুর্লভ সুন্দর এবং ভিলেনরা হয় কুচ্ছিৎ কদাকার। এমনকি রুপকথার গল্পের রাজকুমার-রাজকুমারী এবং শয়তান/ডাইনীর চেহারা ছবি দেখেই চিনে ফেলা যায়, কারণটা কি? কারণটা সোজা। শরীর, শারীরিক সৌন্দর্য্য। সুন্দর নায়ক নায়িকার ভক্ত যত বেশি হয়, কম সুন্দর বা অসুন্দর অথচ মেধাবী অভিনেতার ভক্ত কিন্ত তার চেয়ে অনেক অনেক কম হয়। মানুষের কল্পনা চিরকালই সুন্দর শরীর আর সুন্দর চেহারাকে ঘিরে। এমনকি মানুষের আকর্ষণীয় ব্যাক্তিত্ব বিচার করতে গেলেও আবশ্যিকভাবে শারীরিক সৌন্দর্য্যের বর্ণণা দেয়া হয়, আশা করি অস্বীকার করবেন না।

দ্বিতীয়তঃ বলা হয় যে সমকামীদের সম্পর্ক বেশিদিন টেকে না। বলি কি, ঐ যে বিখ্যাত প্রেমের গল্প “বিলাসী’-র বিখ্যাত কথাটা আছে না, “টিকিয়া থাকাই চরম স্বার্থকতা নহে, অতিকায় হস্তি লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে ” – এই কথাটা প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রেও কিছু কম প্রযোজ্য নয়। এমন অনেক স্ট্রেইট কাপল চিনি আমি, যারা এককালে উথাল-পাথাল প্রেম করেছে, এবং বিয়ের কয়েকবছর পর তাদের প্রেম এক্কেবারে হাওয়া হয়ে গেছে। তারপরও তাদের সংসার যে টিকে আছে সেটা ভালোবাসার জোরে না, বরং সমাজ-সংসারের চাপে, লোকলজ্জার ভয়ে, সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। সমকামীদের ক্ষেত্রে এরকম কোন কিছু তো নেই-ই, বরং সম্পর্ক ভেঙ্গে ফেলার চাপটাই থাকে চারপাশ থেকে। আর ভালোবাসাও ফরমালিন দেয়া আপেল না যে তাকে চিরকাল একইরকম থাকতে হবে। মানুষের অনুভূতি বদলায়, বদলাতেই পারে, কারণ মানুষ নিজেই প্রতিনিয়ত বদলায়। আজকে যাকে আমার খুব পছন্দ, দু’দিন বাদে তাকে অত ভালো না ও লাগতে পারে; শুধুমাত্র প্রেম-ভালোবাসা না, বন্ধুত্বের মতো সম্পর্কেও এই কথা একইরকম খাটে। একসাথে থাকার জন্য ভালোবাসা একলাই যথেষ্ঠ না। পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষজন আমাদের চেয়ে কিছু কম ভালোবাসতে জানে না, প্রেম নিয়ে গদ্য-পদ্য তারা কিছু কম লেখে নি, প্রেমে পড়ে পাগলামী কিছু কম করে না তারা। তারপরও তারা সঙ্গী বদলায়, সম্পর্ক ভাঙ্গে তাদের; কারণ তারা ভালোবাসাবিহীন দাম্পত্যে বিশ্বাস করে না, ভালোবাসা হারিয়ে গেলেও ভালোবেসে যাবার ভান তারা করে না। আমাদের মতো কতগুলো তত্ত্ব আঁকড়ে ধরে সারাজীবন পড়ে থাকে না তারা। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “ভালোবাসাবিহীন দাম্পত্যজীবন ব্যাভিচারের নামান্তর” ।
আর তাই বিষমকামীদের মধ্যে ডিভোর্সের হারটাও অধিক ব্যাক্তিস্বাধীনতা পাওয়া সমাজে এত বেশি।
এদিক থেকে আমি বরং সমকামীদের সমর্থন করবো, ভালোমানুষ সেজে থাকার আশায় বিষমকামীদের মতোন ভালোবাসাবিহীন সম্পর্ক সারাজীবন টেনে-হিঁচড়ে চলে না তারা।

তৃতীয়তঃ বলা হয়, গে-রা না কি শুধুই সেক্স করতে চায়, গে-রা না কি অস্বাভাবিকভাবে সেক্সফ্রিক। আচ্ছা বলুন তো, এই যে দুনিয়াজুড়ে এত এত পতিতাপল্লী, এতশত পর্ণ ম্যাগাজিন, ওয়েবসাইট, সেক্সটয় শপ – এক কথায় গোটা দুনিয়ার পুরো সেক্স ইন্ডাস্ট্রি, তার শতকরা কতভাগ স্ট্রেইটদের জন্য আর কতভাগ গে-দের জন্য? একটু চিন্তা করে দেখুন তো, গোটা দুনিয়ায় যতো যৌন নিপীড়ন হয় তার শতকরা কতভাগ করে সমকামীরা, আর কতোভাগের জন্য বিষমকামীরা দায়ী? এত ধর্ষণ, এত ইভটিজিং – এর শতকরা কতোভাগ গে-দের করা? বয়ঃসন্ধিকালীন ছোকড়া থেকে শুরু করে ঘাটের-মড়া দাড়িওয়ালা বুড়ো পর্যন্ত মেয়ে দেখলে উত্তেজিত হয়ে ওঠে; মাল, তেঁতুল কত্তরকম নাম দিয়ে মেয়েদের ঢেকে চলতে বলে, নইলে না কি শুধুমাত্র মেয়েদের দিকে তাকালেই তাদের খাঁড়া হয়ে যায়। নিজেরা যৌন নিপীড়ন করে তার দোষটা পর্যন্ত চাপিয়ে দেয় ধর্ষিতার ঘাড়ে এই বলে যে সে উত্তেজক ছিলো। মানসিক যৌন নিপীড়নের কথা আর নাই বা বললাম, স্ট্রেইট পুরুষের লোলুপ দৃষ্টির ভয়ে বাচ্চা মেয়ে থেকে শুরু করে মাঝবয়েসী নারী, সব্বাই তটস্থ থাকে। এই তুলনায় গে রা কি করে? শুধুমাত্র পছন্দের সঙ্গীদের সাথে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়, এবং উভয়পক্ষের সম্মতিতেই। তারপরও “সেক্সফ্রিক” ট্যাগ শুধু হোমোদের দেয়াটা কি চরমতম ভন্ডামী না? হয়তো বা বলবেন আমাদের দেশের অধিকাংশ স্ট্রেইট সাধুপুরুষ, তারা সারাজীবন শুধু একজনের সাথেই সেক্স করে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। একবার ভেবে বলুন তো, তাদের কতভাগ সুযোগের অভাবে সাধুপুরুষ, আর কতোভাগ স্বেচ্ছায়? আমাদের দেশে নারী-পুরুষ মেলামেশার সুযোগ কম বলেই এবং যৌনতার ব্যাপারে বাড়াবাড়ি কড়াকড়ি আছে বলেই স্ট্রেইটরা “কম” সেক্স করে। যেসব দেশে এতসব বিধিনিষেধের ঝকমারী নেই, সেসব দেশে গিয়ে দেখুন, স্ট্রেইটরা সতী-সাধ্বি হয়ে বসে থাকে, না গে-দের চেয়ে যৌনতায় কিছুমাত্র পিছিয়ে থাকে? অত ইয়াবা, ভায়াগ্রার কতোভাগ গে দের ভোগে লাগে, আর কতোভাগ স্ট্রেইটদের?

হয়তো বা বলবেন, সব স্ট্রেইট একরকম নয়। তাহলে আমিই বা কেন বলতে পারবো না, সব গে ও এক রকম নয়?
সব দোষ গে-দের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার আগে একটু ভেবে দেখবেন সবাই আশা করি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s