বাংলা উপন্যাসঃ সম ভালোবাসা ৬ষ্ঠ পর্ব

পরিচয়ঃ আকশের মেঘেদের সাথে সময়ও কিছুটা ঊড়ে গেল। এক মাস পেরিয়ে গেছে। জন এখন মোটামুটি এখানকার পরিবেশটার সাথে মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ওয়েদারটার সাথে মানাতে পারেনি। কেমন একটা ভ্যাপসা ভাব। স্যাঁতসেতে। আজকের পরিবেশটাও সেরকম। জনকে একটা কাজে মহকুমা সদরে যেতে হয়েছিল। ফিরতে বিকাল হয়ে গেল। ঘোড়াটাকে সে বেস জোরে ছোটাচ্ছে। দুপাশে সবুজ ধানক্ষেত মাঝখানে ধানক্ষেত। মানুষজন খুব একটা নজরে পড়ছে না। জন তলপেটে প্রবল চাপ অনুভব করল। রাস্তার পাশে বড় একটা শিমুল গাছ, তার নিচে ঘোড়া থামালো জন। আলগা একটা শিকড়ের সাথে ঘোড়াটাকে বাঁধল। রাস্তা থেকে নেমে গেল নিচে। প্যান্টের জিপারে হাত দিল সে। ব্লাডারের চাপ কমার সাথে সাথে সে প্রশান্তি অনুভব করছে।

 

রঞ্জু আজ বিকেলে বাই-সাইকেলে চড়ে হাওয়া ক্ষেতে বেড়িয়েছে। পিসিমা বার বার করে বললেন, হাওয়া ক্ষেতে হলে ঘোড়াগাড়ি করে যা, কেন এই বিলিতি কলে চড়ে পা দুখানাকে কষ্ট দেয়া। রঞ্জু হেসে বলল, শুধু পা দুখানির কষ্ট দেখলে পিসিমা, এতে যে শরীরের কত উপকার হয় তুমি যদি তা জানতে!

–      তাহলে আমাকে আর কঙ্কাকে একজোড়া বাই-সিকল কিনে দে, গ্রামের রাস্তা দিয়ে প্যাডেল মেরে আমরাও হাওয়া খেয়ে আসব।

–      তা চলনা, মন্দ কি! বিলেতে তো মেয়েরাও সাইকেল চালায়।

–      আরে ছ্যাহ! বিলিতি মেয়েদের কথা বাদ দে। রাম রাম। ওরা কি আর মেয়ে থাকে নাকি হাফ ব্যাটা হয়ে গেছে সব। খ্রেরেস্টানের জাতটাই যেন কেমন। মেয়েদের ব্যাটাছেলে বানিয়ে রাখে। মাঝে মাঝে তো বোঝাই যায় না প্যান্টুলুন পরা বাবুটি সাহেব না মেম।

 

পিসি-ভাতিজায় মিলে অনেক হাসাহাসি হল। কঙ্কা তখন সখীর সাথে বসে ছাঁদে পুতুল খেলছে। রঞ্জু সাইকেল ছুটিয়ে অনেক দূর চলে এল। জনের ঘোড়াটা রাস্তা পেরিয়ে ওপাশে গিয়ে ঘাস খেতে লেগেছে। রঞ্জু ঘোড়াটাকা খেয়াল করেল। কিন্তু জনকে সে দেখতে পায় নি। আসলে ঘোড়াটা বেশ সুশ্রী। ধবধবে সাদা চেহারা। তেলতেলে একটা ভাব। রঞ্জুর বেশ পছন্দ হল। এরকম একটা ঘোড়া তার চাইই চাই। ঘোড়াটাকে পাশ কাটানোর সময় ঘোড়াটা ভয় পেয়ে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। রাস্তার উপর পড়ে থাকা দড়িটা টানটান হয়ে গেল। রঞ্জু খেয়াল করেনি। দড়িতে বেঁধে রঞ্জু সাইকেল সহ ছিটকে পড়ল। শিমুল গাছের কান্ডের সাথে মাথাটা ঠুকে গেল প্রচন্ডভাবে। রঞ্জুর মনে হল পৃথিবীটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু দুলছে। মাথার উপরে শিমুল গাছটা ভেঙে তার উপর পড়ছে। রঞ্জু জ্ঞান হারালো। সবকিছু এক নিমিষের ভিতর হয়ে গেল। জন প্যান্টের জিপ্যার লাগাতে লাগাতে ছুটে এল।

 

সে প্রথমে ইতস্তত বোধ করল। দ্রুত রঞ্জু’র পালস দেখল। নিঃশ্বাস পড়ছে। সে স্বস্তি ফিরে পেল। মুখে পানির ছিটা দিতে পারলে ভাল হত। কিন্তু পানি আনার মত কিছু নাই। সে পকেট থেকে রুমাল বের করে ওটাই ভিজিয়ে আনল বিলের জলে। রুমাল নিঙ্গড়ে যেটুকু পানি হল সেটা দিয়ই রঞ্জুর মুখে ঝাপটা দিল। এভাবে কয়েকবার করতে হল।  কপালের ডানপাশটা ছড়ে গেছে। হালকা রক্ত বেরিয়েছে সে রুমাল দিয়ে মুছে দিল। মাটিতে বসে পড়ল সে। রঞ্জুর মাথাটা সে কোলের উপর টেনে নিল। বেশ কোমল চেহাড়া। মায়কাড়া একটা ভাব আছে তাতে। মুখে থুতনির পাশে ফ্যান্সি দাঁড়ী। বোঝা যাচ্ছে ছেলেটা সৌখিন ঘরের কেউ। জনের মনে পড়ে গেল লন্ডনের কথা। এই বয়সে সেও একদিন বরফের উপর স্লিপ খেয়ে পড়ে গেছিল। সবাই ব্যস্ত সেখানে। তাকে তুলে দেয়ার মত লোক কেউ ছিল না। সবাই ছুটছে।

 

বিজন ধানক্ষেতের মাঠে কিশোর একটা ছেলে কোলে নিয়ে বসে আছে জন। বাতাসের ছোটাছুটি, ঝিলিমিলি পাতাদের বাতাসের সুরে নাচানাচি। রঞ্জুর জ্ঞান ফিরল। সে চোখ মেলে তাকাল। জনের মুখটা দেখতে পেল। সে কিছু মনে করতে পারল না। উঠে বসার চেষ্টা করল। পারল না। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। জন হাসিমুখে বাঙলায় বলার চেষ্টা করল, বিষরাম নাও।

 

রঞ্জু এলিয়ে পড়ল, সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগল চোখ বুজে। যাতে শরীরে রক্তকনায় অক্সিজেনের চলাচল বাড়ে। জন হাতের মুঠোয় রঞ্জুর হাতটা তেনে নিল। ঘষে উষ্ণতা দেয়ার চেষ্টা করল। জন শীতের  দেশের মানুষ। কেউ বিপদে পড়লে তাকে উষ্ণ করার চিন্তা তাদের মাথায় আগে আসে। যাতে শীত তাকে কাবু করতে না পারে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s