বাংলা উপন্যাসঃ সম ভালোবাসা ৪র্থ পর্ব

মাছধরাঃ
বিকেলের আলোটা আজ ভালই লাগছে। গাছের ছায়া দীর্ঘ হতে হতে দীঘির জলে এসে পড়েছে। ফুরফুরে একটা বাতাস বইছে। গাছের ডালে বসে পাখিরা সব কুহুতানে মেতে আছে। বিকেলের অবসরে সবাই যেন খোশ গল্প করছে। গাছের ছায়ায় বসে দীঘির জলে শিপ ফেলেছে রঞ্জু। এই দিঘীটা রঞ্জুদের। এই এলাকায় তাদের পাঁচপুরুষের জমদারী ছিল। ছিল বলছি কারণ, রঞ্জুর দাদু প্রকাশ রায় চৌধুরী ছিল বংশের শেষ জমিদার। ইংরেজ সরকারের করা সুর্যাস্ত আইনে তারা জমিদারি হারায়। দাদু শোকে অল্প দিনেই মারা যান। রঞ্জুর বাবা জমিদারী পায়নি কিন্তু জমিদারী মেজাজটা ঠিক পেয়েছিল। আশপাশের কয়েক গাঁ মিলে এখনো তাদের পতিপত্তি টিকে আছে। দশগ্রামের মানুষ সম্মানও করে যথেষ্ট। ইংরেজদের প্রতি রঞ্জুর কেমন একটা বিতৃষ্ণা আছে। মাছ ধরতে এসেছে কিন্তু মাছ ধরার প্রতি তার কোন খেয়ালই নাই। বরশিতে আধার গেঁথে জলে ডুবিয়ে বসে আছে কিন্তু ফানা নড়ল কিনা সেদিকে ভ্রুক্ষেপই নাই। হাতে ধরা বইটাতে সে ডুবে আছে। ইংরেজদের প্রতি রঞ্জুর এলার্জী থাকলেও ইংরেজ সাহিত্যের প্রতি তার অন্যরকম একটা টান আছে। বই পেলে সে নাওয়া-খাওয়া ভূলে সারাদিন পড়তে পারে। এই নিয়ে পিসিমা তাকে কম বকা ঝকা করেন না।

হঠাৎ জলের মাঝে টুপ করে একটা শব্দ হল। হাতের বইটা মুড়ে রেখে চকিতে সে জলের দিকে তাকালো। জলের তাড়নার ফানাটা দুলছে। বড় মাছ আধার গিলেছে ভেবে সে বেশ জোরেই টান দিল। ধ্যুর! কিছুই না। বড়শিটা গিয়ে সামনের হিজলের ডালে গিয়ে আটকাল। তার সাথে চাকর মন্টুও এসেছিল। মন্টুটা যে কোথায় গেল। সে নিজেই উঠে গিয়ে বড়শিটা ছাড়িয়ে নিয়ে এল। আধার গেঁথে আবার পানিতে ছুড়ে দিল। আবার শুনশান নিরবতা। আবারও পানির মাঝে টুপ করে শব্দ হল। রঞ্জু এবার ব্যাপারটা ধরতে পারল। পাশের গাছের জঙ্গল থেকে মেয়েলী কন্ঠের হাসির শব্দ ভেসে এল। রঞ্জু গম্ভীর শব্দে ডাকল, কংকাবতী! বিশ বছর বয়সেই রঞ্জুর কথায় বেশ একটা ভারিক্কি এসেছে। গাছের আড়াল থেকে একটি লাস্যময়ী কিশোরী মুখ উঁকি দিল। চোখে-মুখে কৌতুকের হাসি। রঞ্জু সেই একই ভাবে বলল,

– সটি বনের ভিতর যে দাঁড়িয়ে আছ। সাপে কাঁটলে কে ঠেকাবে?

এতক্ষণ খেলার আনন্দের সাপের কথায় তো মাথায় ছিলনা। আরে গত সপ্তাহে তো মাঝিপাড়ার একটা ছেলেকে সাপে কেটেছিল। কংকাবতী ভয় পেয়ে এক লাফে এসে রঞ্জুকে জড়িয়ে ধরল। নুপুরের শব্দে মুখরিত হল চারপাশ। আরেকটা গাছের আড়ালে দাসী মেয়েটাকেও লুকিয়ে রেখেছিল কংকাবতী। সেও বের হয়ে হাসতে লাগল।
কংকাবতী রঞ্জুর গলা জড়িয়ে ধরে আছে। দাসীর সামনে রঞ্জুর কেমন যেন একটু লজ্জা করতে লাগল। অথচ আগে এটা হত না। সে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল।
– গলা ছাড়ত কংকাবতী।
– আমার স্বামীর গলা আমি ধরেছি। আমার যখন ইচ্ছে আমি ছাড়ব।

রঞ্জু একরকম জোর করেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। চল, বাড়ী চল। উচ্চবাচ্চ্য শুনে মন্টু বেরিয়ে এল। আশেপাশে কোথাও বসে সে তামাকু সেবন করছিল হয়তো। বাতাসে বিশ্রী গন্ধ বেরুচ্ছে। সে শিপ-বড়শী, বই পত্তর গুঁটিয়ে নিল। কংকাবতী’র হাত ধরে রঞ্জু বাড়ীর পথ ধরল। পিছে পিছে সরলা আর মন্টু হাঁটছে। দুপাশে গাছের সারি, মাঝে পায়ে হাটা পথ। বাড়ীর কাছাকাছি হতেই দেখা গেল পিসীমা দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন পথের দিকে চোখ মেলে। আজ কংকার কপালে খারাবি আছে।

বারান্দার রেলিং এর উপর হাত রেখে উদাস দৃষ্টি মেলে রাসমনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেক ছোটকালে পুতুল কোলে নিয়ে স্বামীর বাড়ী চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু সুখ বেশীদিন তার কপালে টেকেনি। বছর কয়েকের মাথায় হাতের নোয়া আর মাথার সিঁদুর নদীর জলে বিসর্জন দিয়ে ফিরে আসে দাদার সংসারে। তারপর এই বাড়ীর আঙিনায় অনেকগুলো শীত বসন্ত কেটে গেছে। রঞ্জুর মায়ের কোল জুড়ে ফুটফুটে রঞ্জু এল।রাসমনীর কোলে রঞ্জুকে দিয়ে রঞ্জুর মা চিরতরে চোখ বুঝলেন এক চৈত্রের সন্ধ্যায়। সেদিন বিলের মাঠে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ছিল। নিঃসন্তান রাসমনি রঞ্জুকে পেয়ে নতুন এক জীবন খুঁজে পেল। এক মুহুর্তের জন্য কোলছাড়া করত না।

বারো বছর বয়সে রঞ্জুর বিয়ে দেয়া হল পাশের গ্রামের জমিদার ঘরে। মেয়ের বাবা আর রঞ্জুর বাবা বাল্যবন্ধু। ছেলে-মেয়ের দিয়ে দিয়ে তারা বন্ধুত্বকে স্থায়ী বন্ধনে বেঁধে নিলেন। মেয়ের বয়স ৫। কঙ্কনা রায় চৌধুরী। রঞ্জুর বাবা আদর করে ডাকেন কংকাবতি। সেই থেকে সে কংকাবতি হয়ে গেছে সবার কাছে। আগে সে রঞ্জু আর কংকা দুপাশে রেখে মাঝে ঘুমাত। ঘুমপাড়ানী মাসি-পিসির গান গেয়ে, রুপকাথার ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর গল্প বলে ঘুম পাড়াতেন। রঞ্জু কৈশোর থেকে যৌবনে পা দিল। এখন সে তার কাছে ঘুমাতে লজ্জা পায়। আলাদা ঘরে রঞ্জুর কাছে কংকাকে মাঝে মাঝে শুতে পাঠায়। কিন্তু মেয়েটা যেতে চায় না। তার গলা জড়িয়ে না ধরলে তার নাকি ঘুম আসে না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s