বাংলা উপন্যাসঃ সম ভালোবাসা ১ম পর্ব

পূর্ব লন্ডনে এবার শীতটা জাকিয়ে বসেছে। সন্ধ্যা’র আঁধার এখনো সেভাবে নামেনি। দূরে ঝাউবনের মাথায় এখনো কিছুটা আলোর আভা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে লোকজনের আনাগোনা কমে গেছে। ফাঁকা রাস্তায় একটা ঘোড়ার গাড়ী ফুলস্পীডে ছুটে গেল। শুকনো পাতারা কিছুদূর ঊড়ে গিয়ে আবার ধরণীর বুকে শুয়ে পড়ল। ম্যাপল গাছের নিচে বাঁধানো বেঞ্চে বসে আছে জন। জন হলমার, ২৪ বছরের তাগড়া এক যুবক। গত জানুয়ারীতে সে চব্বিশে পা দিল মাত্র। কিন্তু পৃথিবীটা তার কাছে খুব বোর লাগছে। গতকাল বিকেলেও সে তার মা কে দেখতে গিয়েছিল। আজকেও গেল। মায়ের অবস্থা খুব একটা ভাল না। মাকে বলবে কি না বলবে এটা নিয়ে সে বেশ কয়েকবার ভাবল। এখানে সে চাকরীর কোন ব্যবস্থা করতে পারল না, অনেক কষ্টে এক বন্ধুর সুত্র ধরে ব্রিটিশ সরকারে চাকরীটা পেয়েছে। ভারতবর্ষে যেতে হবে তাকে।মা হল তার পৃথিবীর সেরা বন্ধু। মায়ের কাছেই আজ সে ইতঃস্তত বোধ করছে। মিসেস হলমার নিজেই জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কিছু বলতে চাও বাবা। জনের কথা শুনে মিসেস হলমার ছেলের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তার স্বামী উইলিয়াম মারা যাওয়ার পরে অনেক কষ্টে জন আর মার্থাকে বড় করেছেন। মার্থার বিয়ে দিয়েছেন। স্বামী রডরিগেজ একটা সওদাগরি অফিসে ক্লার্কের চাকরী করে। কাজের অনেক চাপ। কিন্তু মেয়ে-জামাই মনে হয় সুখে আছে। ছেলেটার একটা গতি হলে শান্তি পেতেন। কিন্তু ভারতবর্ষে ছেলের চাকরী হয়েছে শুনে খুশী হতে পারলেন না। ধরা গলায় ছেলেকে বললেন,

– বাবা, তুমি এখন বড় হয়েছে। ভাল-মন্দ সিদ্ধান্ত এখন তোমাকে নিজেকেই নিতে হবে। আমি আর কদিন। আগে শুনতাম বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো ছেলেরা চাকরী করতে ইন্ডিয়া যায়। তুমি কি পারবে ওই অচেনা জায়গায় নিজেকে মানিয়ে নিতে। যদি যাও তবে অবশ্যই কিন্তু প্রতিমাসে আমাকে চিঠি লিখবে। সবসময় নিজের খেয়াল রাখবে।
জন কি বলবে বুঝতে পারছে না। মায়ের চিকিৎসার খরচ চালাতে তাকে অবশ্যই চাকরীটা নিতে হবে। মায়ের মাথার কাছে মার্থা বসে ছিল। সেও বলার কিছু পাচ্ছিল না। জানালার কার্ণিসের দিকে তাকিয়ে আছে। রডরিকে দিয়ে তো আর কম চেষ্টা করল না। ভাইটার জন্য তার বুকের ভিতর কেমন যেন করছে। ভাইটা তার কিছুটা লাজুক প্রকৃতির, আর সবার মত না। জনের বন্ধুরা যখন বান্ধবীদের পিছনে ঘুরছে সে তখন শেলী কি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতায় ডুবে আছে। মেয়ে পটানোর মাঝে ঠিক সে আগ্রহ খুঁজে পেত না।

মায়ের হাতটা ধরে জন চেয়ারে বসে ছিল। জন মাকে চিন্তা করতে নিষেধ করল। মায়ের আরো কাছে গিয়ে কপোলে আলতো করে চুমু খেল। মায়ের ধরে থাকা হাতটা আস্তে করে বুকের উপর শুইয়ে দিল।কথা বলে মিসেস হলমার ক্লান্ত বোধ করছিলেন। তিনি চোখ বুজলেন। ঠিক ঘুমিয়ে গেলেন কিনা বোঝা গেল না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রডরি আসার পরে মার্থা যাবে। নিঃশব্দে দরজা টা ভেজিয়ে দিয়ে জন একাই বেরিয়ে এল। নার্সিং হোমের ঘরটাতে তার দম বন্ধ বন্ধ লাগে। একটা ওষুধের গন্ধ আচ্ছন্ন করে রাখে।

gay bangladesh

হাসপাতাল থেকে বের হয়ে জন একা একাই অনেকটা পথ হাঁটল। ঠান্ডা লাগছিল। কোটের কলার তুলে দিয়ে কান ঢেকে নিল। হাতে হাত ঘষে শরীরকে কিছুটা উষ্ণতা দেয়ার চেষ্টা করল। হঠাৎ দেশটাকে তার খুব আপন মনে হতে লাগল। কষ্ট আর বঞ্চণা ছাড়া এই দেশ কি দিয়েছে তাকে। ছোট বেলায় বন্ধুরা যখন ঘোড়ার গাড়ীতে করে স্কুলে গেছে তখন সে আর মার্থা বরফ জমা রাস্তার উপর দিয়ে পায়ে হেঁটে স্কুলে যেত। একেকদিন দেরী হয়ে যেত। স্কুলের সিস্টার’রা অনেক বকতেন। ছোট বেলায় সে একা রাস্তা পেরিয়ে নদীটার পাশে যেত খুব ভয় পেত। কিন্তু কি এক অজানা আকর্ষণে নদী তাকে টানত। টেমস নদীর পাড়ে বসে নির্জন সন্ধ্যা উপভোগ করত। আজ কত নদী সাগর পেরিয়ে তাকে ইন্ডিয়া যেতে হবে। আচ্ছা এখান থেকে চাঁদ যতদূর, ইন্ডিয়া কি তার থেকে বেশী দূরে! নিজের মনে প্রশ্নটা জাগতেই সে হো হো করে হেসে উঠল। ধারে কাছে কেউ থাকলে তাকে নিশ্চিত পাগল ভাবত। সে শিক্ষিত ছেলে। সে ভাল করেই জনে চাঁদের তুলনায় ইন্ডিয়া তার অনেক কাছে, ধরতে গেলে বাড়ির বারান্দা। কিন্তু তার গৃহকাতর মন নিজে থেকেই খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে মনকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এসবে পাত্তা দিলে চলবে না। তাকে যেতেই হবে। দরকার হলে আজকেই সে বাক্স-পেটরা গুছিয়ে ফেলবে। ভারতবর্ষ তো এখন ইংল্যান্ডের শাসনে চলে। ওটাও তার দেশ এখন। জন বাড়ীর পথে পা বাড়ালো।

2 thoughts on “বাংলা উপন্যাসঃ সম ভালোবাসা ১ম পর্ব

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s