বাংলা উপন্যাসঃ ভালোবাসা ১০ম পর্ব

সুক্তির মুক্তিঃ অন্যসময় হলে যদু আনন্দে চিৎকার করতে পারত, সাহেবকে ঈশ্বরজ্ঞানে পুজো দিয়ে মাথায় রাখতে পারত। আজ সে কিছুই করল না। টলতে টলতে রাস্তায় নামলো। জন প্রহরীদের দিকে ফিরে  কড়া গলায় জানতে চাইলো, কে করেছে এই কাজ।   প্রহরী নিরুত্তর। পেছনে পাঁচু দাঁড়িয়ে ছিল। সেই উত্তর দিল। ঊড়ে প্রহরী সর্দার বন্দীদের সাথে এই কাজ করে থাকে। জন প্রহরী সর্দারকে ডেকে পাঠালো। সে এসে দাঁড়ালো। যেন কিছু হয়নি এমন ভাব তার। সে টমসন সাহেবের অতি আস্থাভাজন। জন সেটা জানে। তাই সরাসরি তাকে কোন শাস্তি দিতে সাহস করলো না জন। সে ধমকে তাকে সাবধান করে দিল। তুমি যেটা করেছ এটা রেপ। কারো সাথে জোর করে সেক্স করা আইনতঃ দন্ডনীয়। তাছাড়া ব্রিটিশ আইনে সমকামী সেক্স নিষিদ্ধ।  ভবিষ্যতে এরকম কিছু করলে ভাল হবে না। ঊড়ে প্রহরী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো। জন তার নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। পাঁচু পেছনে পেছনে চলল। প্রহরী আড়চোখে পাঁচুর দিকে কড়া চোখে তাকালো একবার।

 

সন্ধ্যার আঁধার নেমে এসেছে গোয়াল ঘরের চালের নিচে, নিম গাছের তলায়। মশারা ভোঁভোঁ আওয়াজে গরুদের জ্বালাতন করা শুরু করেছে।  রান্নাঘরের দক্ষিন পাশে গোয়াল ঘর। গোয়ালে বাঁধা হালের গাইগরু দুটো। থেকে থেকে হাম্বা হাম্বা করে ডাকছে। আজ সারাদিন ওদের কেউ খেতে দেয়নি। ক্ষুধার্ত অবলা জীব। মুখ বাড়িয়ে চালের খড় খাওয়ার চেষ্টা করছে।  গোয়াল ঘরের পাশে মজা পুকুর। কালো হয়ে আছে জল। একটা শোল কি মাগুর মাছ ঘাই দিয়ে গেল। শোল-মাগুর রাক্ষুষে মাছ। পুকুরের অন্য মাছ খেয়ে সাফ করে ফেলে দুদিনেই। তাই মধু ঘরামী মাঝে মাঝে জাল নিয়ে পুকুরে নেমে পড়ে। ঝাল দিয়ে মজগুর মাছের ঝোল রান্না খেতে সে খুব ভালবাসে। পাড়ে তার সাত বছরের ছেলে টুকরি হাতে দাঁড়িয়ে থাকে।

বাড়িতে দুখানা চৌচালা ঘর। বড় খানাতে মদু থাকে। ছোট ঘরখানা যদুর। দুপুর থেকে ঘরের দরজায় খিল দিয়ে পরে আছে রাজলক্ষী।  যদুর বিয়ে করা বালিকা বঊ। সারাদিন সে এক দানা খাবার এক বিন্দু জল স্পর্ষ করেনি। বড়বউ মাধবীলতা অনেক চেষ্টা করেছে তাকে জল-পানি খাওয়ানোর। সে ব্যর্থ হল। সে নিজেই কি ছাই সারাদিন কিছু খেয়েছে। বারান্দায় টানটান হয়ে শুয়ে আছে মধু। চোখ বোজা। কিন্তু সে জেগেই আছে। বিকেলে সে জমিদার বাবুর কাছে গিয়েছিল। জমিদার বাবু বললেন দেখি। তারা কি দেখবেন। তারা ত এখন শুধু নামেই জমিদার। সকালে গিলে মহাজনের কাছে হালের গরু দুটো বাঁধা দিয়ে ভাইকে ছাড়িয়ে আনবে। মাধবী একবার বলেছিল, হালের গরু বাঁধা দিলে জমি চাষ হবে কিভাবে। মধু বলল, পরের ব্যাপার পরে দেখা যাবে। মুখে বললে মাথা থেকে সে ব্যাপারটা তাড়াতে পারেনি।

 

জমি চাষ দিতে না পারলে সে তার বউ ছেলের মুখের অন্ন যোগাবে কিভাবে। যা থাকে কপালে। ভিক্ষে করতে হলে করবে। ভাইকে ছাড়ানো চাই আগে। গরু গেলে আবার গরু হবে। ভাই গেলে কি আর ভাই পাওয়া যাবে। কোন কালাপানির দেশে ভাইকে চালান করে দেবে তা কে জানে।  হঠাৎ মনে হল কে যেন দাদা বলে ডাকল। যদুর মতই গলা। আবার ডাকল। আরে যদু আসবে কোথা থেকে। মাথা কি গরম হয়েছে।  সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে। রাজলক্ষী আলো হাতে ঊঠানে ছুটে এল। তার মানে সেও শুনেছে।  মধু ছুটে গেল। ঊঠানে যদু অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। মাধবী ঘড়া থেকে জল এনে মুখে ছিটিয়ে দিল।

 

বারান্দায় বসে যদু ভাত খাচ্ছে। পাশে ছেলেটা বসে ডাল দিয়ে ভাত চটকাচ্ছে। আজ তাদের কাছে এই ডালভাত অমৃতের স্বাদ লাগছে। মাধবী স্বামীকে জিজ্ঞেস করল, আরেকটু ভাত দেবে কিনা। সারাদিন খাওয়া হয়নি। মধু একাই দুই সের চালের ভাত খেয়ে ফেলতে পারবে আজ। কিন্তু সাহস করে দাও বলতে পারল না। হয়তো মাধবী সব ভাত তার পাতে ঢেলে দিয়ে সারারাত শুধু জল মুখে দিয়ে থাকবে। তার বঊটা অনেক লক্ষী। কিন্তু আফসোস তার জন্য সে ভাল কিছু করতে পারলো না। বছরে এক জোড়া কাপড় ছাড়া সে কি দিতে পেরেছে বউকে।

 

যদুর ঘরে যদু অঘোরে ঘুমোচ্ছে। পাশে বসে রাজলক্ষী হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছে। কেরোসিনের বাতির মৃদু আলোয় তাকে মোহনীয় লাগছে। স্বর্গ থেকে এক ফালি বাতাস বয়ে গেল তাদের বাড়ীর উঠোন দিয়ে। রাতজাগা পাখিটা তারস্বরে ডেকে আবার চুপ করে গেল। রাজলক্ষী আঁচল দিয়ে স্বামীর কপালে জমে থাকা ঘামটা মুছে দিল। দরজায় মাধবী এসে দাঁড়িয়েছে। রাজলক্ষীকে বলল, চল বোন এবার দুটো মুখে দিবি। বলে সে উঠানে নেমে গেল। 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s