বাংলা উপন্যাসঃ ভালোবাসা ৮ম পর্ব

কাছারীবাড়ীঃ জনকে ইদানীং কাজে একটু বেশী ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। কৃষকেরা সময় মত খাজনা পরিষোধ করে না। আবার সুর্যাস্ত আইনে জমিদারী হারানো জমিদারেরা বিদ্রোহের হুতাশনে বাতাস করে যাচ্ছে তলে তলে। জন কে সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে। টমসন সাহেব তো একদিন বলেই ফেললেন, এত দূরদেশে হাওয়া খেতে এসেছ ভাল কথা। কিন্তু সরকার যে তোমার পেছনে মাসে মাসে তংখা ব্যয় করছে সে জন্য তো তোমার কাজে একটু মনোযোগ দেয়া উচিত। এই বাঙালী খুবই হারামী জাতি। এদের সাথে মিষ্টি ব্যবহার করে কোন লাভ হবেনা। উত্তমরূপে চাবকাও, দেখবে তোমাকে এরা ঈশ্বরের মত ভয় করছে।  জন আজ কাছারী বাড়ীতে বসেছে। ঝালর লাগানো পাখা পাতে পেছনে দাঁড়িয়ে পাচু বাতাস করছে। ঊড়ে দারোয়ান কে ডেকে বললেন, ফরিয়াদীকে হাজির করতে। ফরিয়াদী হিসেবে যাকে তেনে নিয়ে আসল, সে নিজের ইচ্ছেয় এসেছে বলে মনে হল না। পাহারাদার দু-চার ঘা দিয়েছে তা চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ঠোঁটের কোনায় শুকনো রক্ত দেখা যাচ্ছে। মধু আর যদু দুই ভাই। দুই বছরের খাজনা বকেয়া আছে।মধু ঘরামীর বয়স চল্লিশের উপর। সে জনের পায়ের উপর উপুর হয়ে পড়ল। পা পর্যন্ত আসতে পারল না। আসার সাহসও নেই। ভূমিতেই মাথা রেখে বারবার বলতে থাকল, এবারকার মত খাজনা মওকুফ করে দেন হুজুর। খাজনা আদায় নিয়ে জনের উপর চাপ যাচ্ছিল। মেজাজটাই গরম হয়ে গেল। এভাবে সবার খাজনা মওকুফ করে দিলে রাজ্যপাট চলবে কিভাবে। পেছনে দাঁড়ানো যদুর চাহনীতে সে ঔদ্ধত্য দেখতে পেল। সে পাহারাদারকে হুকুম করল যদুকে গারদে আটকে রাখতে। যদি খাজনা নিয়ে আসতে পারো তো কাল ভাইকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেও।

 

পাচু ফিসফিস করে বলার চেষ্টা করল, এতদিনে যখন পারেনি সে কালকের ভিতর খাজনা কোথা থেকে যোগাড় করবে। জন গম্ভীর ভাবে অন্য দিকে মুখ ফেরালো। নাহ সব কথা শুনলে হবে না। তাকে তো তার দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে। যদুর বয়স উনত্রিশ ত্রিশ হবে। ফাটকে আটকে রাখবে শুনে যদুর কলিজা শুকিয়ে গেল। সে ভাসা ভাসা শুনেছে, সাহেবরা যখন মাল খেয়ে টাল হয় তখন তাদের মর্জি ঠিক থাকেনা, মেয়ে-ছেলে পুরুষ-ছেলে তারা আলাদা করতে পারে না। মেয়েদের বদলে পুরুষকেই তারা ভোগ্যবস্তু বানিয়ে নেয়। এই জন্যই তো সাহেবেরা পশুর জাত। হেগে পানি নেয় না। গা ধোয় না। যদু ঘরামী পাথরের মত শক্ত হয়ে গেল। পাহারাদার যদুকে টেনে হিঁচড়ে হাজতে নিয়ে আটকে রাখল। মধুকে ছেড়ে দেয়া হল। সে দিশাহীন হয়ে টলতে টলতে রাস্তায় নামল।কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। রাস্তা দুদিকেই গেছে। সে হয়তো দ্বিধায় পড়ে গেছে কোন দিকে যাবে। কোন রাস্তায় তার সমাধান আছে! বাপ মারা যাওয়ার পর অনেক কষ্টে ভাইটাকে আগলে রেখেছে। নিজে না খেয়ে ভাইকে খাইয়েছে। গেল বছরের আগের বছর পৌষ মাসে তিন গ্রাম পরে সোনাকান্দি গ্রামে ভাইটারে বিয়ে করিয়ে আনল। সেই ভাইকে ফাটকে রেখে সে কিভাবে বাড়ী যাবে!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s