বাংলা উপন্যাসঃ ভালোবাসা ৭ম পর্ব

জমিদার বাড়ীঃ  সবুজ গাছ-গাছালির ফাঁকে মাথা উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার বাড়ীর শ্বেত পাথরের তেতলা দালান। গায়ে পুরাতনের ছোপ লাগলেও এখনো জৌলুস কমেনি। তার রুপ থেকেই বোঝা যায় পড়ন্ত এই জমিদার বাড়ীর ফেলে আসা শান-শওকতের ইতিহাস। সদর দরজায় পাহারাদার ছিল। জন রাশ টেনে ঘোড়ার গতি কমালো। পেছনে রঞ্জু বসা দেখে প্রহরী কিছু জিজ্ঞেস করল না। নতজানু হয়ে অভিবাদন করল। ঘোড়ার লাগাম হাতে নিয়ে সে মূল ভবনের দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। বাঁধানো রাস্তায় ঘোড়ার খুর থেকে টাকুর টুকুর  শব্দ হতে লাগল। ভবনটার ভিত অনেক উঁচু। প্রশস্ত এক সারি সিঁড়ি উঠে গেছে বারান্দায়। বারান্দায় সাদা মার্বেল পাথরের খাম, অনেকটা গ্রীক শৈলীতে তৈরী। সামনে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে বাগান করা হয়েছে। পাতাবাহারের ঝাড়ের ওপাশের মাটির মঞ্চে লাল লাল থোকা ফুল ফুঁটে আছে। জনের চেনা ফুলগুলোর ভিতর পড়ে না, কিন্তু বেশ চোখে লাগল। একটা মৃত ফোয়ারা দেখা যাচ্ছে গোলাপ বাগানের মাঝে। সিড়ির সামনে পৌছে জন অনেকটা লাফিয়ে নামল। হাত ধরে রঞ্জুকে নামালো। রঞ্জুর মধ্যে ইতঃস্তত ভাব। এমনিতেই সে সবল একজন মানুষ। কিন্তু মাথায় ধাক্কাটা লাগার পর সে আর ব্যালেন্স করতে পারছে না যেন।

রঞ্জুর কপালে রক্তের দাগ দেখে চাকরদের মধ্যে হুলস্থুল শুরু হয়ে গেল। পৌড়া দাসী কাঁদতে কাঁদতে এসে রঞ্জুকে কুরসী টেনে বসালো। প্রথমে সে জনকে খেয়াল করে নাই। জনের দিকে চোখ পড়ায় সে চেয়ার টেনে বসতে বলে সভয়ে সরে গেল। সাহেবসুবোদের এরা জমের মত ভয় পায়। পিসিমা ছাদে ছিলেন। আজ বেশ রৌদ উঠেছিল। তাই বৈশাখে করা আমের আচার রৌদে দিয়েছিলেন সেগুলো নাড়াচাড়া করছিলেন। রঞ্জুর বাবা সকালে পাতে আচার খেতে খুব পছন্দ করে। দাসীর মুখে খবর শুনে প্রথমে রাসমুনির কেমন যেন একটা চমক লাগল। হাতের বোয়েমটা পড়ে ভেঙে গেল। শুকনো ছাদে তেল গড়িয়ে যেতে থাকল। রাসমনি ছুটতে ছুটতে নিচে নেমে এল। রঞ্জুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। রঞ্জু সলাজ হেসে পিসিমাকে প্রবোধ দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল। পিসিমা আঁচল ভিজিয়ে কপালের জমাটবাঁধা শুষ্ক রক্ত মুছিয়ে দিলেন। তার নিষেধ না শোনার জন্য মৃদু ভৎসনা করলেন।

 

জন কিছুটা অবাক হয়ে দেখছিল। রঞ্জুর চোখ পড়ল জনের চোখে। জন জেনে গেছে রঞ্জু টরটরা ইংরেজী বলে। সে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, Your mother. রঞ্জু মাথা নেড়ে বলল, No, She is my aunt. কঙ্কা কখন এসে চেয়ারের পাশে হাতল ধরে দাঁড়িয়ে আছে কেউ খেয়াল করেনি। সে কি করবে বুঝতে পারছিল না। মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকিয়ে সাহেব দেখছিল।রঞ্জুর সাথে চুলটানাটানি করেই সে বড় হয়েছে এই বাড়িতে। তার সবসময় মনে হয় পিসি তার চেয়ে রঞ্জুকে বেশী আদর করে। এজন্য সে কয়েকদিন কপট রাগ দেখিয়ে অন্ন বন্ধ করেছে। অবশ্য রাগ বেশীক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারত না। রঞ্জুর বাবা এসে ডাক দিত, কই আমার কঙ্কাবতী কই, কে তাকে বকেছে শুনি। দাসিকে ডেকে বলত, ও সরলা দিদি, খাবার দাও দেখি, আজ আমি আর কঙ্কা মা এক পাতে খাব। পেয়াদাকে ডেকে বলতেন, ওরে হাবু ভাল দেখে একখানা পাকা বেতে তেল মাখা তো, আজ রঞ্জুর পিঠ সমান করে দেব। কঙ্কা মহা আনন্দে শ্বশুর মহাশয়ের সাথে খেতে বসত।রঞ্জু, পিসির কাছে অভিমান করে বলত, বাবা লাই দিয়ে কঙ্কাকে নষ্ট করছে। রাসমনি হাসতে হাসতে বলতেন, তো যা না, বাবাকে গিয়ে বল, বাবা তুমি আমার বউকে নষ্ট করোনা। আমার বউয়ের উপর আমার ষোল আনা দাবি। রঞ্জু লজ্জা পেয়ে মুখ ঘোরাত। রঞ্জুর বাবা কাছারি ঘরে ছিল। খবর পেয়ে চলে এলেন। এসে দেখেন খুব সাংঘাতিক কিছু নয়। মেয়ে মানুষ অল্পতে উতলা হয়ে পড়ে। রাসমনি ব্যগ্র হয়ে জানতে চাইল, ডাক্তারকে খবর দেয়া হয়েছে? চৌধুরী মশায় বললেন, রাসু, ওকে উপরে নিয়ে শুইয়ে দাও। পরিমল ডাক্তার এখনি চলে আসবে।

 

জনের সাথে আগে আলাপ হয়েছে চৌধুরী সাহেবের। লোকটাকে জনের ভাল লেগেছে। প্রশান্ত সৌম্য চেহারা। ব্যবহারে রুচির পরিচয় প্রকাশ পায়। অতিশয় ভদ্র বিনয়ী ব্যক্তিত্ব। জনকে বসার ঘরে নিয়ে বসাল। হাবুকে চা-পানি দেয়ার হুকুম করলেন জমিদারী মেজাজে। জনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন, পাঁচ মিনিটের ভেতর ফিরে আসবেন বলে। খড়মে আওয়াজ তুলে চৌধুরী সাহেব বাড়ীর ভিতরে অন্তর্ধান হলেন। জন ঘরের ভিতর টা নজর বুলিয়ে নিল। দামী আসবাবে ঠাসা। দেয়ালে হরিণের শিং, বাঘের চামড়া ঝুলছে। সুমুখে খোলা বাতায়ন। সে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালো। পেঁপে গাছে বসে দুটি সবুজ টিয়া পাকা পেঁপে খাচ্ছে। পাহারাদার দেখতে পেয়ে ঢিল ছুঁড়ল। টিয়াপাখি উড়ে গেল। জনের মন টিয়াপাখির ডানায় ভর করে অনেক দূরে চলে গেল। সেই লন্ডনে। তার মা নিশ্চই নার্সিং রুমের বেডে একাকী শুয়ে আছে। মা কি ঘুমিয়ে আছে। নাকি জেগে তার কথা ভাবছে। ইচ্ছে করছে এক ছূটে দৌড়ে গিয়ে মাকে দেখে আসতে। রাসমনিকে দেখে তার মায়ের জন্য মনটা কেমন যেন ডুকরে উঠল। পৃথিবীর সব মা এক রকম।

 

কোণ কিছুর শব্দে কল্পণা থেকে জন বাস্তবে ফিরে এল। দরজার ওপাশ থেকে কেউ যেন ছুটে সরে গেল। নুপুরের রুনুঝুনু শব্দ পাওয়া গেল। জন দরজায় এগিয়ে গেল। নাহ কাউকে দেখা গেল না। ফাঁকা করিডোরে জন-মানুষের অস্তিত্ব নাই।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s