বাংলা উপন্যাসঃ ভালোবাসা ৯ম পর্ব

অ তিথীঃ বিকেলে জনের সদর দরজায় একটা ঘোড়ার গাড়ী এসে থামল। পাঁচু খবর নিয়ে গেল ভিতরে। এই অসময়ে তো দর্শনার্থী, বিচারপ্রার্থী কারো আসার কথা না। পাচু কে যতই জিজ্ঞেস করে কে এসেছে, বলে ছোট বাবু এসেছেন। ছোট বাবুর নাম ধরতে হয়তো এদের শাস্ত্রে নিষেধ লেখা আছে। এদের শাস্ত্রে যে নিয়মের শেষ নেই তেমনি এদের পূজ্য দেবতার গোনাগাথা নাই। ভোরের সূয্য এদের দেবতা, মাঠে ঘাস খাওয়া গরুটাও এদের দেবতা। পূজ্য দেবতাদের তবু এরা নাম ধরে দূর্গা, গনেশ, কার্তিক। কিন্তু পরমপূজ্য এসব মনূষ্য দেবতার নাম এরা কিছুতেই ধরবে না। 

 

দেয়ালে টাঙানো বড় পৃথিবীর ম্যাপটার দিকে রঞ্জু তাকিয়ে ছিল। জন ঘরে ঢুকতেই সে ঘুরে দাঁড়ালো। দুজনের চোখাচোখি হল। রঞ্জু একটা জিনিস অবাক হয়ে খেয়াল করেছে, জনের সাথে দেখা হলে তার ভাল লাগে। মনে হয় কতদিনের চেনা। খুব কাছের কেউ মনে হয়। হাসি দিয়েই জনকে স্বাগত জানাল। জন রঞ্জুর স্বাস্থ্যের কুশল জানতে চাইল। আগামী সোমবার জনকে রঞ্জুদের বাড়ীতে নিমন্ত্রন করতে এসেছে। জন সানন্দে রাজী হল। যদিও দেশীয় খাবার নিয়ে তার মনে কিঞ্চিত ভীতি আছে। বাঙালীরা কিভাবে যে এত ঝাল খায় সে বুঝে উঠতে পারল না।

 

যাওয়ার বেলায় রঞ্জু কিছুটা ইতঃস্তত করে টেবিলের উপর একটা টাকার থলে রাখল। জন জিজ্ঞাসু নেত্রে জানতে চাইল। রঞ্জু আস্তে আস্তে জবাব দিল, মধু ঘরামীর খাজনার টাকাটা আছে। কাল সকালেই যেন যদু ঘরামিকে ছেড়ে দেয়া হয়। একসময় এরকম মানুষদের টাকায় আমাদের জমিদারী চলেছে। আমাদেরও একটা দ্বায়িত্ব আছে এদের পাশে দাঁড়ানোর।

 

রঞ্জু বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল। পেছন ফিরলে দেখতে পেত জন তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মহানুভব, অন্যের দূঃখে কাতর এই ছেলেটাকে জনের খুব ভাল লেগে গেল। হাতের মুঠোয় সে রঞ্জুর রেখে যাওয়া টাকাটা তুলে নিল। সে ম্যাপের দিকে তাকাল। প্রথমেই চোখ পড়ল ইংল্যান্ডের উপর। মজার একটা ব্যাপার হল, ম্যাপের দিকে তাকালে সবার নজর পড়ে তার নিজের এলাকার উপর। রঞ্জু যেমন দেখছিল ভারতবর্ষের অংশ।

 

জন কয়েদ খানার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। প্রহরী দুজন উঠে দাঁরিয়ে অভিবাদন জানালো। জন দরজা খুলতে ইঙ্গিত করলো। খুবই সাধারণ পরিবেশ। সাধারনতঃ সাময়িকভাবে এখানে কয়েদিদের আটকে রাখা হয়। পরে মহকুমা সদরে চালান করে দেয়া হয়। ঘরের ভেতরটা অপরিচ্ছন্ন। লাল রঙের দেয়ালে এখানে ওখানে ছোপ ছোপ দাগ। মেঝেতে খড় বিছানো। আটকে রাখা কয়েদিদের রাতে এটার উপর শুতে হয়। অবশ্য যাকে আটকে রাখা হয় তার কলিজা শুকিয়ে থাকে। সে আর ঘুমাবে কি। সারারাত অন্ধকারে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

 

জন এখানে আসার প্রয়োজন বোধ করেনি কখনো। আজ আসলো রঞ্জুর জন্য। রঞ্জু ঘোড়া ছুটিয়ে এতটা পথ এল আর সে এটুকু  আসতে পারবে না। সে নিজে মুখে যদু কে মুক্তির খবর দিতে এল। দেয়ালে আটকানো হুকের সাথে যদু বাঁধা ছিল। পুরো নগ্ন। তার ময়লা ধুতিখানি ধুলোয় গড়াগড়া খাচ্ছে। যদুর পা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। জন বুঝতে পারল সে  প্রহরীদের কারো কামনার শিকার হয়েছে। অবসন্ন চোখে যদু জনের দিকে একবার তাকালো। সে নিজের ভেতর আরো কুকড়ে গেল। সাহেবদের নিয়ে গ্রামে অনেক কথাই শুনেছে। এবার কি সাহেব তার মনের আঁশ মেটাতে এসেছে। একটা দেহ একদিনে আর কত অত্যাচার সহ্য করতে পারে।

 

এই পরিস্তিতিতে জন ঠিক কি বলবে বুঝতে পারছে না। সে প্রহরীদের হুকুম দিল যদুকে মুক্ত করতে। মুক্ত যদুকে সে ভাঙা বাঙ্গলায় বলল, যডু, টুমি ফ্রি। টোমাদের সব ট্যাক্স মওকুফ করে দেওয়া হল।  টুমি বাড়ী যেটে পাড়ো।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s