সমকামী-গরুর-হাটে

হ্যাঁ। শিরোনামটার দু’ধরনের অর্থ হতে পারে। পাঠক সমাজ সব সময়ই লেখক সমাজ অপেক্ষা অধিক জ্ঞান রাখেন, তাই আর অর্থের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মাননীয় পাঠক সমাজের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চাই না। যাই হোক মূল কথায় চলে আসি। আজকে গরুর হাটে গিয়েছিলাম। ঠিক ধরেছেন, সমকামী গরুর হাটে। সমকামী বলে তো আর কুরবানীর ঈদে কুরবানী না দিয়ে থাকতে পারিনা, তাই না! যাক সে কথা। হাটে গিয়েছিলাম বাবা আর বড় ভাইয়ের সাথে। একটু পর পরই বড় ভাইয়ের ঝাড়ি খাচ্ছিলাম, বারবার পিছিয়ে পড়ছিলাম কিনা! কিন্তু উনাকে কে বোঝাবে যে গরু দেখা উনাদের কাজ, আর গরুর খরিদ্দার দেখা আমার। তাই শর্টস আর টি-শার্ট পরা গরু খরিদ্দারদের দেখতে দেখতেই আমার পিছিয়ে পড়া। যাইহোক ঝাড়িপট্টি খেয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। হারামি মনটাকে বোঝালাম এখানে আসার মূল কারন গরু কেনা, খরিদ্দারদের সাথে ছেনালী করা নয়।

************************************************

– কালু, তুমি আর আমি কতদিন একসাথে ছিলাম বলো তো!
– হুম, তা প্রায় বছর চারেক তো হবেই।
– আচ্ছা, আমাকে ভুলে যাবে না তো কালু?
– ছি লালু, সে কি কথা? তাই কি কখনো হয়। তুমি আমার জনম জনমের সাথী। দুইজনে একসাথে লাঙ্গল টানা, একসাথে জাবর কাটা, মালিকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে গোয়ালঘরে রাতের আঁধারে রতিক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ার মধুময় সেসব স্মৃতি কি এত সহজেই ভোলা যায়?
– সত্যি, সে ভোলার নয়। আচ্ছা, তুমি আমাকে সত্যি ভালবাসতে?
– হাম্বা! কি বললে? এখনো সন্দেহ?
– না, মানে ধবলীকে যেভাবে সেদিন আঁকড়ে ধরলে!
– কি আর বলব দুঃখের কথা! ধবলীর উপর চড়ার শখ আমার কোন কালেই ছিল না। কিন্তু মুর্খ মালিকটা কি সে কথা বুঝবে? সে ভাবে তার মতো আমিও বুঝি নারীত্বের স্বাদে তৃপ্ত। তাই আমাকে সেদিন জোর করে ধবলীর গায়ের উপর উঠিয়ে দিয়েছিল। ওইভাবে কারো গায়ের উপর উঠলে আপনা আপনিই জিনিসটা গরম হয়ে যায়। তাই আর সেদিন মাথাটা ঠাণ্ডা রাখতে পারিনি লালু। তাছাড়া মালিকের তো আবার বাছুর দরকার। তাই আমার একটু সাহায্য তার দরকার ছিল। ধবলীর দুধ বেঁচেই তো মালিকের সংসার চালাতে হবে তাই না?
– হুম, তা ঠিক।

***********************************************

ছেনালী শব্দটা আমার গুরুর থেকে চুরি করা। উনি আবার এই বিদ্যেয় বিশেষ পারদর্শী কিনা! যাইহোক গরুর দামাদামি শুরু করলো বড় ভাই আর বাবা। আমি নিরব দর্শক, তবে চোখের কাজ কিন্তু থেমে নেই। পাশে দাঁড়ানো খরিদ্দারের দিকে কুনজর পড়ে গেল। বেচারা অনেক্ষণ ধরেই এসেছে হয়তো। গরু দেখতে দেখতে পরিশ্রান্ত। তাই ক্লান্ত হয়ে অবসন্ন হাত দুটো মাথার উপর তুলে দিয়ে ছয় প্যাক যুক্ত কোমড় খানা বাঁকা করে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাস! আমাকে আর পায় কে? গো+এষণা শুরু করে দিলাম। টিশার্টটা ছোটই ছিল, তাই হাত উঁচু করাতে বেশ খানিকটাই উঠে গেল। ভালোই হল যে বেল্ট পড়ে নি। হালের কেতাদুরস্তি অনুযায়ী শর্টসটা নাভি থেকে বেশ কিছু নিচে নামানো। নাভি থেকে সরু লোমের একখানা রেখা নিচে নামতে নামতে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। কোথায় গিয়ে যে হারিয়েছে, সে অতল তলের সন্ধান করা হাটে দাঁড়িয়ে সম্ভব নয়। তাই মনকে সামাল দিয়ে খরিদ্দারের পৃষ্ঠদেশের সৌন্দর্য অনুধাবনের জন্য তার পেছন দিকে নজর দিলাম। ভাব খানা এমন ধরলাম যেন কত মনোযোগ দিয়ে আমি গরু খুঁজছি। গরুর দিকে কি আর নজর পড়ে? সমকামী নজর বলে কথা! নজর বজ্জাতটা ঠিক যেয়ে খরিদ্দারের পেছনের দিকে গিয়ে আটকে গেল। আহা! খাসা! ছোটখাট টিলা বললে খুব একটা ভুল হবে না। পাশাপাশি সাজানো দুধে আলতা বর্ণের দুইখানা টিলা। টিলা দুইটার মাঝখানে একটা সরু নদী বয়ে গেছে যেন, টিলা দুটোকে দুইভাগে বিভক্ত করে। নদীর শুরুটাই দেখতে পেলাম। শেষটা দেখা এখানে সম্ভব নয়।

*************************************************

– আচ্ছা লালু, আমাদের দুজনকে যদি দুজন খরিদ্দার কিনে নিয়ে যায়?
– তাহলে? আমাদের আর কখনই দেখা হবে না?
– তাই তো মনে হচ্ছে। লালু, তোমাকে যদি আর কোনদিন দেখতে না পাই? মৃত্যু তো আমাদের অবধারিত। হাটে আসার আগে ভেবেছিলাম একসাথে বাঁচতে না পারি, অন্তত একসাথে মরতে তো পারব। কিন্তু তাও যদি না হয়?
– তাহলে উপায়?
– দুঃখ করে আর কি লাভ? কপালের লিখন না যায় খন্ডন।
– আমি তোমাকে খুব মিস করবো কালু। ( লালুর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে।)
– আমিও। (কালুর চোখেও জল।) তোমাকে শেষ বারের মতো একটু আদর করতে ইচ্ছা করছে লালু। একটু জড়িয়ে ধরি?
– ধরো।

**************************************************

হঠাত প্রচন্ড চিৎকার চেঁচামেচিতে আমার গবেষণায় বিঘ্ন ঘটলো। আশে পাশের বেশ কয়েকটা জায়গায় ষাঁড়গুলো বলদগুলোর উপর উঠে যাচ্ছে। কোরবানীর হাটে গাভীর তেমন দাম পাওয়া যায় না, তাই ব্যবসায়ীরা সব ষাঁড় আর বলদ নিয়ে আসে গ্রাম থেকে। গাভীর অভাব বোধ করে ষাঁড়গুলো হঠাত উত্তেজিত হয়ে পড়লে সামনে থাকা বলদটিকেই বেছে নেয় কাম লালসা নিবারণের জন্য। আমাদের মতো তো আর ওদের লোকলজ্জার ভয় নেই! আবার ক্ষুরমৈথুনের সুযোগ ও নেই, তাই রাস্তা ঘাটে যখন যেভাবে পারে, কামকাজ সেরে নেয়। আমাদের সামনে থাকা কালো গরুটাও লালটার উপর উঠে যাচ্ছে। সবাই যে যার মতো নিজের জান বাঁচাতে যেদিক পারছে ছুট দিচ্ছে। আর আমার মতো ফাজিল কিছু পোলাপান লাইভ সেক্স এর মজা লুটার জন্য হা করে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে।

বাবার ঝাড়ি খেয়ে সংবিত ফিরে পেলাম। “ওই! এদিকে আয়!” একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বাবা হুঙ্কার দিলেন। আমি বরাবরই সুবোধ বালক। তাই বহুদিনের শখ লাইভ সেক্স দেখার কাজটা অসমাপ্ত রেখেই বাবা আর ভাইয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে বাধ্য হলাম। গরুর রাখাল আর ব্যবসায়ীরা তখন তাদের গরুদের একটাকে আরেকটার উপর থেকে নামাতে ব্যস্ত। এর মধ্যে খেয়াল করলাম আমাদের সামনে থাকা লাল আর কালো গরু দুটার চোখে পানি। কালোটা লালটার উপরে উঠেছিল, তাই লালটার একটু অপমান বোধ হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু কালোটা কাঁদছে কেন?

বুঝে গেলাম ওদের মাঝের সম্পর্কটা। সত্যিকার ভালবাসার বিচ্ছেদে দুই পক্ষই কাঁদে। খুব মায়া লাগলো দেখে। একজন আরেকজনকে খুব করে ভালোবাসতো হয়তো। সমকামী তো, তাই সমকামী প্রানীদের কষ্টটা উপলব্ধি করে সমব্যাথী হতে পারি সহজেই। গরু দুটার জন্য খুব কষ্ট লাগলো। আহারে! সব সমকামীদের জীবন একই রকম।

ওরা হতে পারে গরু, আমরা মানুষ। কিন্তু নামে আর কাজে ছাড়া আর বিশেষ তেমন পার্থক্য কি আমাদের মাঝে আছে? অনেকেই হয়তো গরু আর মানুষের মাঝে অনেক অমিল খুঁজে বের করে আমার উপর চড়াও হবেন। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, আসলেই কি কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায় না? ওরাও সমকামী, আমরাও সমকামী। ওদের মাঝেও আবেগ আছে, ভালোবাসা আছে, আমাদের মাঝেও আছে। ওদের ভালবাসার যেমন কোন স্বীকৃতি নেই, আমাদের ভালবাসারও নেই। সব চাইতে ধ্রুব সত্য যেটা, সেটা হল ওদের শেষ পরিণতি যেমন বিচ্ছেদে, আমাদেরও কি তাই নয়?

***********************************************

বাবা লাল গরুটা পছন্দ করেছেন। ৪০ হাজার টাকা দাম। বাবাকে বললাম, “আব্বু, কালো গরুটাও কিনি!” বিশাল এক ঝাড়ি দিলেন বাবা, “দুইটা গরুর টাকা কি তুই দিবি?” তাই তো! আমাদের পক্ষে দুইটা গরু কেনা সম্ভব না, সম্ভব না কালু আর লালুর একসাথে মরার স্বপ্নটা পূরণ করা। বিচ্ছেদ তথা সমকামী ভালবাসার শেষ পরিণতিটা আজ গরুর হাটে গিয়ে আবারো উপলব্ধি করলাম।

3 thoughts on “সমকামী-গরুর-হাটে

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s