এই মুহূর্তটা ভালবাসার

– হ্যালো, অপূর্ব?
– হুম বেবি বলো।

(বিশাল এক হাই তুলল অপূর্ব। ১০টা বাজে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস তার নেই। তাও আবার ছুটির দিনে।)

– তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো। আমার বাসায় আসতে পারবে আজ দুপুরে?
– কী? তোমার বাসায়? কেমনে সম্ভব? বাসায় কেউ নাই?

(অপূর্বর ঘুম পুরোপুরিই ভেঙ্গে যায় এবার। মনের মানুষকে একান্তে পাওয়ার লোভনীয় প্রস্তাব। তাও আবার ছুটির দিনে। তিন পায়ে খাড়া হয়ে যায় অপূর্ব।)

– বাসায় কেউ নাই। আজকে ভাইয়া ভাবী ভাইয়ার শ্বশুর বাড়ি গেছে। তবে তোমাকে ডাকার পিছনে অন্য একটা উদ্দেশ্য আছে। কিছু জরুরী কথা বলার ছিল।
– ওরে আমার ময়না পাখি! জরুরী কথা, না? বুঝি বুঝি সবই বুঝি। ও ভালো কথা, তোমাকেও আমার একটা জরুরী জিনিস দেখানোর ছিলো।
– কী?
– আছে আছে! বলা যাবে না।
– কেন বলা যাবে না?
– সামনা সামনি দেখো।
– এইসব ভাল্লগে না। অর্ধেক কথা একদম বলবে না। না বলতে চাইলে নাই বলতা!
– আহারে! আমার সোনাটা রাগ করেছে? আচ্ছা, বলছি। কিন্তু বললে তো তুমি আবার রেগে মেগে ফায়ার হয়ে যাও।
– আচ্ছা রাগবো না। বলো। আমি ঠিক করেছি এখন থেকে তোমার উপর আর কখনোই রাগবো না।

(সুহাসের কন্ঠ ভারী হয়ে আসে।)

– কী হয়েছে জান? তোমার কন্ঠ এমন শোনাচ্ছে কেন? এনিথিং রং?
– না না, কিচ্ছু হয় নাই। তুমি বলো কি বলতে চাচ্ছিলা। আমি রাগ করবো না। নির্ভয়ে বলো।
– হা হা হা।
– কী হলো? বলো!
– কুতুব মিনারের আশে পাশের জঙ্গল কেটে সাফ করেছি গতকাল। সেটাই তোমাকে দেখাতে চাইছিলাম।
– ও।
– রাগ করলা?
– নাহ্‌, রাগ করবো না বললাম না? আচ্ছা, তুমি কী বলো তো? সারাদিন খালি সেক্স আর সেক্স। মাথায় আর কিছু আসে না তোমার?
– মাথায় যদি সারাদিন তুমি ঘুরাঘুরি করো, তাহলে সেক্স ছাড়া অন্যকিছু আসবে কেমনে জান?
– রাগ না করার লাইসেন্স দিয়ে দিছি দেখে যা ইচ্ছা তাই বলছো, তাই না?
– হা হা হা। তোমাকে রাগাতে খুব ভালো লাগে। ইশ তোমাকে যদি এখন দেখতে পেতাম। রাগে তোমার গাল দুইটা ফুলে একদম লাল হয়ে গেছে তাই না? ওইরকম রাগন্ত টকটকে গালে চুম্মা দিতে খুব মন চাচ্ছে। না না। দাড়াও, আজকে আমি ব্যাপক হট। শুধু চুমায় কাজ হবে না। আজকে তোমার গালে জোরে একটা কামড় দিয়ে যদি দাগ না বসিয়ে দিয়েছি, তো আমার নাম ও অপূর্ব না।
– থাক আসার দরকার নাই।
– এই, রাগ করলে নাকি? আমি তো দুষ্টামি করছি।
– আমি বললাম কিছু সিরিয়াস কথা বলার জন্য আজকে তোমাকে ডেকেছি, আর তুমি কী সব সেক্সুয়াল কথা বলা শুরু করে দিলে।
– কেন ডার্লিং? জানো না sex is the most serious matter in life!
– তাই, না! আচ্ছা ঠিক আছে।
– ওই জানু, রাগ করো নাই তো? আমার কি আর ১০১ টা জান? আমার তো ওই একটাই জান। তাই তোমারে একটু জ্বালাই।
– হুম। ঠিক আছে। কি খাবা দুপুরে? ঘরোয়া থেকে খিচুড়ী আনাবো?
– না, বাইরের কিছু খাবো না। আমার জানের হাতের আলু ভর্তা আর ডিম ভাজি খাবো। সাথে ঘন ডাল।
– অপূর্ব,আমার শরীরটা ভালো না, কিছু বোধ হয় রাঁধতে পারবো না। বাইরে থেকে খাবার আনাই? আজকে একটু কষ্ট করে খেয়ে নাও?
– তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো না। কতদিন পরে তোমার সাথে দেখা হচ্ছে। ভাবলাম কতদিন পর তোমার হাতের রান্না খাবো!
– আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। দেখি কতদূর কি করতে পারি।
– বেশি কষ্ট হবে জান?
– না ঠিক আছে। ব্যাপার না।
– করো করো। একটু কষ্ট করো। আমার জন্য করবা না তো কার জন্য করবা?
– হুম। আচ্ছা, আমি ফোন রাখছি। তুমি ২ টার দিকে চলে আসো।ওকে?
– ওকে সুইট হার্ট। লাভ ইউ।
– হুম। রাখছি।

দুই সপ্তাহ পর আজ সুহাসের সাথে দেখা হবে। অপূর্ব খুব এক্সাইটেড। প্যারিস থেকে আনা নেক্সাস স্মার্ট ওয়াচটা আজ সুহাসকে দেবে। এ জন্যই আজকে খুব রাগিয়ে দিয়েছে সে সুহাসকে। রাগ আর কপট অভিমান তো ভালোবাসারই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন অভিমান করে গাল ফুলিয়ে থাকবে, অন্যজন সে ফুলে থাকা গালে ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে অভিমান ভাঙাবে। এর নামই তো ভালবাসা। কিভাবে সুহাসের অভিমান ভাঙবে তা ভেবে মনে মনে খুব খুশি হলো অপূর্ব। দুপুরে খাওয়ার পরে আয়েশ করে সুহাসের বিছানায় গা এলিয়ে দেবে সে। শুয়েই পরিপাটি করে সাজানো বিছানাটা এলোমেলো করে দেবে। এই দেখে সুহাস তো রেগে মেগে একদম ফায়ার ই হয়ে যাবে। এলোমেলো বিছানা সুহাসের একেবারেই পছন্দ নয়। সে অপূর্বকে টেনে বিছানা থেকে নামিয়ে দিয়ে আগে বিছানা ঠিক করবে। সে যখন বিছানা ঠিক করতে যাবে, ঠিক সেই সময় পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরবে অপূর্ব। সুহাস এক ঝটকায় সরিয়ে দিতে চাইবে অপূর্বকে, অপূর্ব সেটা জানে। কিন্তু ঠিক ওই সময় সুহাসের ঘাড়ে নিজের গাল ঘসে সুহাসকে উন্মাদ করে দেবে অপূর্ব। সুহাসের কানে আলতো করে একটা কামড় দিয়ে ফিসফিস করে বলবে, “এই পাগল, আমি তোমাকে ভালবাসি।” সুহাস বলবে, “কচু বাসো। তাহলে এতদিন দেশের বাইরে ছিলে কেন আমাকে ফেলে?” “সেজন্যই তো ক্ষতিপুরণ নিয়ে এসেছি, এই দেখ।” বলেই পকেট থেকে স্মার্ট ওয়াচ টা বের করে সুহাসের বাঁ হাতে পড়িয়ে দেবে অপূর্ব। সুহাসের অবাক হয়ে যাওয়া মুখটার কথা চিন্তা করে একা একাই হাসল অপূর্ব। অবাক সুহাসের ঠোটের কোনে ফুটে উঠবে এক চিলতে হাসি। এই হাসির জন্য অপূর্ব নিজের জান দিয়ে দিতেও কুন্ঠা বোধ করবে না কোনদিন। কারন সে জানে তার বেঁচে থাকার স্বার্থকতাই হলো সুহাসের মুখের এক চিলতে হাসি। অনেকদিন সুহাসের হাসিমাখা মায়াবী সে মুখটা দেখা হয় না, ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে দেয়া হয় না সেই হাসিমাখা মুখে গোলাপের পাপড়ির মতো নরম ঠোঁটে। আজ এতদিন পর সে সুযোগ এসেছে। ঘড়িতে এগারোটার সঙ্কেত। বিছানা ছেড়ে উঠলো অপূর্ব। ফ্রেশ হয়ে জুস আর স্যান্ডউইচ এর প্লেট টা নিয়ে টিভির সামনে বসলো। বাংলা চ্যানেল গুলোর ন্যাকামি অপূর্বর দুই চোখের বিষ। সোজা চলে গেলো ডিসকভারি চ্যানেলে। অন্য সময় পশু পাখি নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম দেখায়। আজ দেখাচ্ছে লাং (ফুসফুস) ক্যান্সার এর উপর। অপূর্ব মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। সিঙ্গাপুরের একটা হসপিটাল দেখাচ্ছে। একেবারে ইনিশিয়াল স্টেজে থাকা লাং ক্যান্সার এর রোগীদের ট্রিটমেন্ট কিভাবে করা হয় তা দেখাচ্ছে। অপূর্ব পুরো প্রোগ্রামটা এক বসায় দেখে শেষ করলো। সাড়ে বারোটা বাজে। জুম্মার দিন, নামাজে যেতে হবে। সুহাস ছেলেটা যে কি না? তার মতো এথিস্টকেও ভালবাসার টানে কি রকম রিলিজিয়াস বানিয়ে ফেলেছে। আসলে ভালবাসার মানুষের জন্য সব কিছুই করা সম্ভব। এখন অপূর্ব পুরোপুরি নামাজি। ফজরটা খালি বাদ যায়, রাত জেগে কাজ করে তো, তাই। কিন্তু সুহাস তাতেই খুশি। চার ওয়াক্ত তো পড়ে। অপূর্ব ভাবছে ফজরের নামাজটাও আস্তে আস্তে শুরু করে দেবে। সুহাস কে খুশি করার কোন সুযোগই সে হাতছাড়া করতে রাজি নয়। খুব মজা হবে, যেদিন অপূর্ব সুহাসকে ভোরবেলায় নামাজের জন্য জাগিয়ে অবাক করে দেবে। বলবে- “এই বেনামাজি। এতক্ষন ঘুমাও কেন? ফজরের নামাজের সময় চলে যাচ্ছে সে খেয়াল আছে?” সুহাস নিশ্চয়ই খুব অবাক হবে। এই ছেলেটা এত অবাক হতে পারে না! আরে বাবা অবাক হবি ভালো কথা,সেটাকে প্রকাশ করতে হবে কেন? লুকিয়ে রাখা যায় না? কিন্তু না। সুহাস কোন কিছুই লুকাতে পারে না। আর এ জন্যই সুহাসকে তার এত ভালো লাগে।

আজ প্রায় পনেরো দিন পর অপূর্বর সাথে দেখা হবে। সুহাসের খুব খুশি হওয়া উচিৎ, কিন্তু সে খুশি হতে পারছে না কিছুতেই। কারণ আজকের দিনটাতে সে অপূর্বকে কিছু কথা বলবে। অতি গুরুত্বপূর্ন কিছু কথা। সুহাহসের জ্বর। পেটে ব্যাথা। তারপরো সে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়। ভাত চড়াতে হবে, ডাল রাঁধতে হবে, আলু ভর্তা করতে হবে, শেষে আবার গরম গরম ডিম ভেজে অপূর্বর পাতে তুলে দিতে হবে। শরীরে একটুও বল নাই, তারপরও অপূর্বর কথা ফেলতে পারা সুহাসের সাধ্যের বাইরে। যত কষ্টই হোক সে অপূর্বর জন্য আজ রাঁধবে। হয়তো শেষবারের মতোই! বিশাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাতের চাল ধুতে শুরু করে সে।

নামাজের আগেই অপূর্ব নিজেকে তৈরি করে নিয়েছে সুহাসের জন্য। সাদা সালোয়ার আর গাঢ় নীল পাঞ্জাবী। গত ভালোবাসা দিবসে সুহাসের দেয়া উপহার। ব্যাকব্রাশ করা চুল সুহাহসের খুব পছন্দের। তাই নিজের সিল্কি চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে নিলো অপূর্ব। গায়ে মাখলো AXE. সুহাসের প্রিয় পারফিউম। ভালবাসার মানুষের জন্য নিজেকে সাজানোর মধ্যেও এক অন্যরকম আনন্দ আছে। যাদের জীবনে নিখাদ ভালোবাসা কখনো ধরা দেয়নি, তারা এর স্বাদ কোনদিনও বুঝবে না।

জুম্মার নামাজ পড়ে ২ টা পনেরোর দিকে সুহাসের বাসায় কড়া নেড়ে অপেক্ষা করছে অপূর্ব। অন্যদিন হলে হাতে এক বক্স ক্যাডবেরি থাকতো, কিন্তু আজকে সে ইচ্ছে করেই আনেনি। আজকে সুহাসকে খেপিয়ে তুলতে হবে। ওর রেগে যাওয়া মুখটা একদম দেখার মতো।

দরজা খুলে দিলো সুহাস।

– আসো, ভেতরে আসো।
অপূর্বর হাতে ক্যাডবেরির বক্স নেই। অন্যদিন হলে এ নিয়ে এক দান ঝগড়া হয়ে যেতো এতক্ষনে। কিন্তু আজ মনে মনে খুশিই হলো সুহাস। অপুর্ব তার জন্য কাজটা সহজ করে দিচ্ছে।
এদিকে সুহাসের এমন আচরনে রীতিমত অবাক অপূর্ব। কী ব্যাপার? দুই সপ্তাহ পর দেখা। ভেতরে আসতে বলে হন হন করে রান্নাঘরের দিকে ঢুকে গেলো সুহাস। অভ্যাসমত জড়িয়ে ধরা তো দূরে থাক, বসতেও বলল না অপূর্বকে। অপূর্ব সুহাসকে কী রাগিয়ে দেবে? নিজেই সুহাসের ব্যবহারে হতবাক। এ কোন সুহাস? এ তো দুই সপ্তাহ আগের সেই সুহাস নয়! এই দুই সপ্তাহে কী এমন হলো সুহাসের যে সে এতোটা পাল্টে গেলো!

– খেতে আসো।
– এতো তাড়াতাড়ি? মাত্র তো এলাম। একটু কথা বলি?
– না, কথা পরে বলা যাবে। আমি তো আর কোথাও চলে যাচ্ছি না, আর তুমিও মাত্র গতকালই প্যারিস থেকে এলে। আজই নিশ্চয়ই আবার কোথাও পাড়ি জমানোর পরিকল্পনা নেই আশা করি!
সুহাস ব্যাপক খেপে আছে। ওকে আরো খেপিয়ে দিতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই সুবোধ বালকের মতো খাবার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো অপূর্ব।

– হাত ধুয়ে আসো!
– খাইয়ে দেবে না?
– না।
– আচ্ছা বাবা এতো রাগ করার কি আছে জান? আমি তো মাত্র দুই সপ্তাহের জন্যই বাইরে ছিলাম। আর এতো ব্যস্ত ছিলাম যে কি আর বলবো! আচ্ছা, এর মধ্যে আমি তোমাকে মেইল করিনি বলো? ফোন দেইনি কারন আমি যে সময়টায় ফ্রি হতাম তখন বাংলাদেশে ঘুমের সময়। তাই তোমাকে ডিস্টার্ব করতে চাইনি।
– অপূর্ব, শুরু করো। ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
– না খাবো না। এভাবে রাগ করে থাকলে আমি খাবো না।
– আচ্ছা খেও না। উঠো। রুমে চলো।

টেবিল থেকে উঠে পড়ে সুহাস।

– এতো তাড়াতাড়ি? আমার জানের বুঝি আর তর সইছে না?
– ধ্যাত!

রুমের দিকে পা বাড়ায় সুহাস। চেয়ার ছেড়ে উঠে খপ করে সুহাসের ডান হাতটা ধরে ফেলে অপূর্ব।

– আচ্ছা বাবা। সরি। তোমাকে খাইয়ে দিতে হবে না, আমি নিজেই নিয়ে খাচ্ছি।
(অপূর্বর উল্টা পাশের চেয়ারে বসে পড়ে সুহাস।)
কী হলো? তুমি খাবে না?
– খেয়েছি।
– বাহ্‌। খুব ভালো অনেক উন্নতি হয়েছে দেখা যায় এই দুই সপ্তাহে।

এবার আর সিরিয়াস না হয়ে থাকতে পারে না অপূর্ব। দুই সপ্তাহ পরে এসে সুহাসের থেকে এ ধরনের আচরণ আশা করেনি সে। রাগ বা অভিমান করতেই পারে। তাই বলে একা একাই খেয়ে নেবে? শুকনা ভাত, ডিম আর আলু ভর্তা দিয়ে খেতে খুব কষ্ট হয় অপূর্বর। তবু ডালের বাটিটার দিক হাত বাড়ালো না একবারও। নিজ হাতে খাবার তুলে নেয়াটা অপূর্বর অভ্যাসের মধ্যে পড়ে না। এটা সুহাস জানতো। তারপরও এক বারের জন্যও এক চামচ ডাল তুলে দিল না সে অপূর্বর পাতে। তাই অপূর্বও প্লেটে থাকা আলু ভর্তা আর ডিম ভাজি দিয়ে কষ্ট করে ভাতগুলো গিলতে থাকে। একটু পর পর পানি খেয়ে গলা থেকে শুকনা ভাতটা নিচে নামায়। তবু ডালের বাটিটা ছুঁয়েও দেখলো না সে।

কোনমতে ভাত খাওয়া নামক শাস্তিটা থেকে অব্যাহতি পেলো অপূর্ব। তার প্রিয় খাবার ডিম ভাজি, ডাল আর আলু ভর্তা। কিন্তু এতোটা কষ্ট করে তার প্রিয় এ খাবারটা তো সে খেতে চায়নি! হাত ধুতে ধুতে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো অপূর্ব।

– রুমে আসো।

সুহাসের গলায় সেই অবহেলার সুর। “কেন যে এলাম!” মনে মনে ভাবল অপূর্ব।

– বসো। কিছু কথা বলার জন্য আজ তোমাকে ডেকেছি।
– নাকি অপমান করার জন্য?
– আমি আর আমাদের সম্পর্কটা চালিয়ে যেতে চাচ্ছি না।
দীর্ঘশ্বাসটা অবলীলায় বেরিয়ে এলো অপূর্বর বুক থেকে। তাহলে এ কথা বলার জন্যই ডাকা? ফোনেও তো বলতে পারতো। এভাবে ঘরে ডেকে অপমান করার দরকার ছিল না।
– কেন জানতে পারি?
– ম্যাঞ্জামে একটা ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছে। তুমি তো দেশে ছিলে না, এর মধ্যে টাইম পাস করার জন্য ম্যাঞ্জামে ঢুকি। শুভ্রর সাথে পরিচয় হয়। দেখা করি। খুব ভালো মানুষ।
– বাহ্‌! খুব ভালো।
– হুম। আসলেই খুব ভালো। জানো আমরা না এর মাঝে দুইবার সেক্স ও করেছি। He is a good performer, I must say.
– O really? I think he is better than me!
– Obviously he is. তা না হলে কি আর তোমাকে ছাড়ি?
– তোমার কাছে তাহলে সেক্সটাই শুধু ইম্পরট্যান্ট? আমি কিছুই না?
– অবশ্যই আমার কাছে সেক্সটাই ইম্পরট্যান্ট। তুমিই না আজ বললে, sex is the most serious matter in life! আর সমকামীরা যে বহুগামী হয় সেটা নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়!

আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো সুহাস। কিন্তু হঠাত এক দলা ঘৃণা মিশ্রিত থুতু এসে পড়লো তার মুখের উপর। থেমে গেলো সে।

– তোর মতো পুরুষখেকোর কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কীইবা আশা করা যায়? (নিজের ভালবাসার মানুষের মুখে থুতু ছিটিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় অপূর্ব, প্রচণ্ড ঘৃণায়।)
– সেটাই। কী হলো? চলে যাচ্ছ নাকি? আরে তোমার ফেভারিট U & Me আনিয়ে রেখেছি। এক দান খেলে যাও!

ধরাম করে দজায়।বন্ধ হওয়ার শব্দে কেঁপে ওঠে সুহাস। আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না সে। চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। এতো বড় অভিনয়টা সে করলো কি করে? এতোটা নিষ্ঠুর সে হতে পারলো? তাও আবার তার অপূর্বর সাথে? “আল্লাহ্‌ তুমি অপূর্বকে শক্তি দাও। যেন সে এই ধাক্কাটা সামলাতে পারে। প্রচন্ড ঘৃণায় যেন ভুলে যেতে পারে আমাকে। ” কাঁদতে কাঁদতে বার বার এই কথাটাই বলতে থাকে সুহাস।

সুহাসদের বাসা থেকে বেরিয়ে পকেট থেকে নেক্সাস স্মার্ট ওয়াচটা বের করে একবার দেখে অপূর্ব। প্রচন্ড ঘৃণায় ছুঁড়ে ফেলে দেয় দামি স্মার্ট ওয়াচটা।

এক সপ্তাহ পর,

– হ্যালো অপূর্ব?
– কে?
– কিরে চিনতে পারছিস না? আমি সাব্বির।
– হ্যাঁ সাব্বির বল। কি খবর?
– সুহাসের কি হয়েছে রে?
– আমি কি করে বলবো ওর কি হয়েছে? ওর সাথে আমার আর কোন সম্পর্ক নেই।
– ওকে দেখলাম ইবনে সিনায়। ওর বড় ভাইয়ের সাথে। খুব দুর্বল দেখাচ্ছিলো।
– দেখগা কার সাথে কি করে আবার এইডস বাঁধায়ে বসে আছে! বাদ দে। তোর কথা বল।
– নারে, তোর কোথাও ভুল হচ্ছে। ওকে দেখলাম ইবনে সিনার ক্যান্সার ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হচ্ছে। খুব দূর্বল দেখাচ্ছিলো। আমার মনে হয় ওর ক্যান্সার।
– কি?
– হ্যাঁ। তুই একবার খবর নিয়ে দেখ।
– আচ্ছা দেখি।

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না অপূর্ব। সুহাসের ক্যান্সার? কিভাবে সম্ভব? গত সপ্তাহেই তো দিব্যি ভালো ছিলো। নিজের মনকে কিছুতেই মানাতে পারছিলো না অপূর্ব। তাই ফোন দিয়ে বসলো সুহাসের ভাইকে।
– হ্যালো, সুহৃদ ভাইয়া?

– কে বলছেন?
– ভাইয়া, আমার নাম অপুর্ব। আমি সুহাসের বন্ধু। সুহাসকে মোবাইলে পাচ্ছি না তাই আপনাকে ফোনটা দিলাম। ও কি অসুস্থ?
– হ্যাঁ ভাইয়া। ওর লাং ক্যান্সার। (বলতে গিয়ে গলাটা ধরে আসে সুহৃদের)
– কি বলেন? সত্যি?
– ডাক্তার তিন মাসের সময় বেঁধে দিয়েছে।

আর কথা বলতে পারেনা সুহৃদ। কাঁদতে থাকে। ওদিকে অপূর্বর হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে গিয়ে কলটা কেটে যায়। মনের অজান্তে অপূর্বর গাল বেয়ে নেমে আসে দু ফোঁটা অশ্রুধারা।

সেদিন সন্ধ্যায়,

– হ্যালো,
– হুম বলো অপূর্ব। ভালো আছো?
– তোমার সাথে দেখা করতে চাই।
– কেন? সব তো শেষ। আর দেখা করে কি হবে?
– তোমার দেয়া কিছু উপহার ছিল আমার কাছে। সেগুলো ফিরিয়ে দিতে চাই।
– কাউকে দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দাও। আমি তোমার সাথে দেখা করেছি শুনলে শুভ্র আবার মাইন্ড করতে পারে।
– তুমি যদি দেখা না করো, আমি তোমার বাসায় এসে সিন ক্রিয়েট করবো। তখন সেটা শুধু তোমার শুভ্রর জন্য না, তোমার বাসার সবার জন্যই একটা সমস্যার কারন হতে পারে। ভেবে দেখ।
– কোথায় আসব?
– ধানমন্ডি লেকে। কাল ঠিক বিকাল পাঁচটায়।
– ওকে।

পরদিন,

– তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? অসুস্থ?
– জ্বর।
– কতদিন ধরে?
– সেটা তো তোমার জানার দরকার নেই। গিফট ফেরত দিতে এসেছো, দিয়ে চলে যাও।
– শুভ্র কেমন আছে?
– ভালো। অপূর্ব, আমি উঠবো।
– কোন উঠাউঠি নাই। আমি যা বলবো তাই তোমাকে আজ করতে হবে। তা না হলে এই পাবলিক প্লেসে তোমাকে বেইজ্জত করবো। আমাকে তো তুমি চেনোই।
– আচ্ছা বলো।
– আমি কিছু প্রশ্ন করবো ঠিক ঠিক জবাব দেবে।
– আচ্ছা।
– আমাকে মিথ্যা বলেছ কেন?
– কি মিথ্যা বললাম? তুমি শুভ্রর সাথে কথা বলতে চাও? ওকে শুভ্রকে কল দিচ্ছি। কথা বলো।
– আমি কি বলছি যে শুভ্রর ব্যাপারটা মিথ্যা?
নিজের ফাঁদে নিজেই নিজেই পড়ে গেছে সুহাস। কোন কথা বলতে পারছে না। তাকিয়ে আছে মাটির দিকে।
– এই তোমার বিশ্বাস? এই তোমার ভালবাসা? আমাকে এতটা স্বার্থপর ভাবলে?
এবার আর চুপ থাকতে পারে না সুহাস। কান্না মিশ্রিত গলায় বলে ওঠে,
– আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি অপূর্ব। আমি চাইনা তুমি আমার জন্য নিজের জীবনটাকে নষ্ট কর।
– শোন সুহাস। তুমি এত দিনেও আমাকে চিনতে পারলে না? আমি যখন তোমাকে ভালবেসেছি, তখন সত্যিকার ভাবেই ভালবেসেছি। কারো কারো জীবনে ভালবাসা হয়ত অনেকবার আসে। কিন্তু আমি তাদের দলে পড়ি না। তোমার সাথে দেখা হওয়ার আগে আমি কি রকম এথিস্ট আর সেক্স ফ্রিক ছিলাম সেটা তো তুমি জানোই। তারপর তুমি যখন আমার জীবনে এলে আমি জানলাম ভালবাসা কাকে বলে। তুমি আমাকে ভালবাসতে শেখালে। আমি শিখলাম নিজেকে ভালবাসতে, নিজের সৃষ্টিকর্তাকে ভালবাসতে। তুমিই আমার জীবনের প্রথম ও শেষ ভালবাসা। আর কাউকে কোনদিন ভালবাসা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই এক সপ্তাহ আমার যে কিভাবে কেটেছে আমি তোমাকে বলে বুঝাতে পারবো না। তোমাকে অনেক গালি দিয়েছি মনে মনে। অনেক ঘৃনা করেছি। কিন্তু তুমি ছাড়া অন্য কাউকে আমার জীবনে স্থান দেয়ার কথা চিন্তাও করতে পারিনি। তুমি আমার জীবনে না থাকলে আমি হয়তো আবার আগের মতো সেক্স ফ্রিক হয়ে যেতাম, কিন্তু অন্য কারো হাত ধরে পথ চলা? No Way.
– এতো ভালোবাসো? (সুহাসের চোখে পানি)
– এখনো সন্দেহ?
– কিন্তু আমার হাতে তো আর বেশিদিন নেই। ডাক্তার সময় বেঁধে দিয়েছে তিন মাস।
– জানি। সুহৃদ ভাই বলেছে। আমি সিঙ্গাপুরের একটা ক্যান্সার হসপিটালের সাথে যোগাযোগ করেছি। ওরা বলেছে ইনিশিয়াল স্টেজে থাকা ক্যান্সারের চিকিৎসা হতে পারে।
– কিন্তু সে তো অনেক টাকার ব্যাপার।
– আমি আছি না?
– আমি জানি তুমি আছো। কিন্তু আমি তোমার টাকা নিতে পারি না অপূর্ব।
– কেন? আমি কি তোমার কেউ নই? আমি কি তোমাকে ভালবাসি না?
– সেটা কথা না। আমি জানি তুমি আমাকে কতটা ভালবাসো। কিন্তু তোমার যা কিছু আছে সেটা তোমার ভবিষ্যতের জন্য তোমার বাবা রেখে গেছেন।
– ভবিষ্যৎ কি কেউ দেখেছে? আর আমরা কে কয়দিন বাঁচব তা তো আল্লাহ্‌ তা’লাই ভালো বলতে পারেন তাই না? দেখা গেল তোমার আগে আমিই ফুরুত!
– ছি! ও কথা বলো না। আমি কল্পনাও করতে পারি না।
– তাহলে এ কথা কেন ভাবছো যে তোমাকে ছাড়া একটা জীবন আমি কল্পনা করতে পারি? শোন, বাঁচা মরা আল্লাহর হাতে। তাই বলে আমরা কি চেষ্টা করবো না? আমি পড়েছি অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেয়াটাও আল্লাহ্‌রই হুকুম।
– ঠিক আছে, আমি চিকিৎসা করাবো। তোমার জন্য করাবো। তবে শর্ত হলো যদি আমি সুস্থ হয়ে উঠি, তাহলে তোমাকে আমার চিকিৎসা বাবদ যা খরচ হয়েছে তা ফেরত নিতে হবে। আমি চাকরি করে তোমার সেই টাকা পরিশোধ করব।
– এত আত্নসম্মানবোধ? আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। তুমি যা চাও তাই হবে। তুমি যে সিঙ্গাপুর যেতে চেয়েছো তাতেই আমি খুশি। এবার কি জনাবের মাথাটা আমার কাঁধে একটু রাখা যায়?
আর কোন কথা বাড়ায় না সুহাস। এই মুহুর্তটা কথা বলে সময় নষ্ট করার জন্য নয়। এই মুহূর্তটা ভালবাসার। শুধুই ভালবাসার। তাই অপূর্বর কাঁধে পরম আস্থার সাথে, ভালবাসার সাথে মাথাটা রাখে সে। বলে ওঠে,
– I love you
– I love you too baby.

3 thoughts on “এই মুহূর্তটা ভালবাসার

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s