বকুল আহমেদ লেখা বিশেষ গল্পঃ “কবি ও তার দহণকাল”

১।
জামী বিছানায় শুয়ে আছে।
মাত্র গোসল করে এসেছে। শরীর মোছার পরও বিন্দু বিন্দু পানি চুল চুয়ে বিছানায় পড়ছে। সেদিকে তার খেয়াল নেই।
চিত হয়ে শুয়ে সে এখন মোবাইলে মেসেজ দেখছে। এহসানের আসার কথা দুপুর দুটোয় । অফিস থেকে বের হয়ে মেসেজ দেয়ার কথা। এখন পৌনে দু’টা অথচ কোন মেসেজ নেই।

একবার ভাবল নিজেই টেক্সট করে। কিন্তু করলো না। বরং উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দিল। পর্দা সরাতেই জানালার ওপাশে এক ময়ুরকন্ঠী নীল আকাশ নিজেকে মেলে ধরে । নীল আকাশের ক্যানভাসের একপাশে রেইনট্রি গাছের পাতাগুলো খুব হেলে দুলে নড়ছে। যেন জামী জানালার পর্দা সরিয়ে দেয়ায় তারা খুব খুশী।
ফ্রেশ গোসলের পর জামী সাধারনত তার শরীরে বেবি পাউডার বুলোয়। তারপর সেই সুগন্ধের সাথে কিছুখন শুয়ে থাকে। কিন্তু এখন পাউডার বুলোতে ইচ্ছে করছে না।

গায়ের তাওয়েলটা খুলে ফেলে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ে। সাথে শুধু নিজস্ব নগ্নতা।
খর পুরুষের মত রোদ্দুরে আকাশকে আমল দেয় না। অপলক চোখে তাকিয়ে দেখে জানালার ওপাশের হাসিখুশি দিনটাকে। এক অসম্ভব ভালো লাগায় তার মন ভরে ওঠে। এহসান যখন আজ তাকে বলেছে আসবে তখন তার যতটুকু ভালো লেগেছিলো এখন তার থেকেও বেশী ভালো লাগছে।
একবার সে নিজেকে দেখে আর একবার দেখে আকাশকে। হৃদয় ঠান্ডা করা এক শান্তি। হঠাত এত ভালো লাগার কি কারণ – ভেবে পায় না। অথচ আজ ঘুম থেকে উঠেই তার মনটা কি খারাপই না ছিল – অজানা সব শংকা- অজানা সব সংশয়- বললে কে বিশ্বাস করবে। সে জানে সে একটু আবেগ প্রবণ। অল্পতেই সে ভীষণ খুশি হয় আবার অল্পতেই হৃদয় ও চক্ষু ভারী হয়ে আসে।
এত আবেগপ্রবন বলেই কি তার প্রিয় সাহিত্য কবিতা? সে নিজেও একটু আধটু কবিতা লিখতে ভালোবাসে। কবিতার লাইন মাথায় আসার আগে তার এমন ভাব আসে – সহসা আনন্দ কিংবা সহসা বিষাদের। যেমন এই মুহূর্তের নিজস্ব নিঃসঙ্গতা, নগ্নতা আর ঐ ঝলমলে আকাশ নিয়ে তার মাথায় কয়েকটা লাইন ঘুরছে। এগুলো লিখে না ফেলা পর্যন্ত একটা অস্থিরতা থাকবেই। মনে মনে সে আওড়াতে থাকে,
চিত হয়ে শুয়ে আছে নগ্ন পুরুষ
নিঃসঙ্গ কামরায়
দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে
নিরুত্তাপ চোখে দেখে সে এক
সবজান্তা আসমান
মাঝে শুধু পাঁজরের হাড়ের মত
জানালার শিক
“ আমারে আর কে ভালবাসে?”-
বাতাসে রোদ্দুর দুলে উঠলে
আসমান হেসে ওঠে
যেন সে সবজানে…
নাহঃ, শেষ চার লাইন যেন ঠিক হচ্ছে না। জামী মনে মনেই আবার শেষ লাইনগুলো ঠিক করতে থাকে-
বাতাসে রোদ্দুর দুলে উঠলে
নগ্ন পুরুষ বলে
হে আকাশ
বলতো, আমাকে কে সত্যিই ভালোবাসে?
তেপান্তরের মাঠের মত বিশাল নীল আকাশ
মোনালিসার মত হাসে
যেন সে এর উত্তর জানে…
ক্রিং ক্রিং ক্রিং
পুরোন রিংটোনে তার মোবাইল ফোন বেজে উঠলে কবিতার সাথে জামীর সংলাপ ভেস্তে যায়।
অগোছালো কবিতাটি অসমাপ্তই থেকে যায়।

২।

-কি হল ঘুমায়ে গেছ নাকি? কলিং বেলটা কি নষ্ট? মোবাইলের ওপাশে এহসানের রাগতঃ স্বর
-হুমম – দুটো প্রশ্নের উত্তর একসাথেই দেয় জামী
-কখন থেকে দরজা ধাক্কাচ্ছি – দরজা খুলো।
-আসতেছি। মৃদু স্বরে বলে জামী। যেন কাব্যালাপে বাগড়া দেয়ায় সে একটু বিরক্ত। কিছুক্ষন আগে খুলে ফেলা টাওয়েলটা আবার গায়ে জড়িয়ে নেয়।
দরজার আই হোলে চোখ গলিয়ে সে এহসানকে একঝলক দেখে নেয়। কালো প্যান্ট। নেভী ব্লু শার্ট। স্কাই নীল আর সাদা স্ট্রাইপের টাই। কালো জুতো। হাতে কোট আর কাঁধে ল্যাপটপ। অফিসিয়াল ড্রেসে শালা এক জিনিস — নিজের মনে বলে আবার নিজেই হেসে ওঠে। রাগ করলে করুক। তার সামনে শুধু টাওয়েল জড়িয়ে থাকতে পারবে না। সে দরজাটা খুলে দিয়ে –লিভিং রুমে একটু বসো, এখুনি আসছি – এই বলে এহসানের উত্তরের অপেক্ষা না করে নিজের রুমে ছুটে আসে।
গোসলের পরের অসমাপ্ত পাউডার পর্ব শেষ করে। নতুন কেনা politix ব্র্যান্ডের ধবধবে সাদা আন্ডারওয়ার পড়ে। সাথে নীল-সাদা গ্রামীন চেকের শর্টস ও সাদা নাইকী পোলো। এরপর চলে Calvin Klein এর পারফিউম, লিপজেল, হেয়ার জেল আর ক্রীমপর্ব। তারপর আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকেই বলে- “ Are you a brand-baby ?”
মাত্র ১০ মিনিট! অথচ লিভিং রূমে এসে দেখে এহসান সোফায় বসেই ঘুমিয়ে গেছে। টেলিভিশন চলছে।জামী সন্তর্পনে পা টিপে টিপে এসে বসে। কারিগর যেভাবে তার সদ্য গড়া দেবী মূর্তির দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকে সেভাবেই সে এহসানের দিকে তাকিয়ে থাকে। এতবার দেখা এতবার স্পর্শ করা ঐ চেহারায় এত কি মায়া – সাধারন চৌকোনা মুখ, মাথায় পাতলা হতে থাকা চুল, বিস্তৃত কপাল, ভরাট ও খর পুরুষালী গাল, মধ্যম ফুলো ঠোঁট, খাঁজহীন চিবুক – কি এমন আলাদা বিশেষ কিছু যা তাকে সিন্দাবাদের সেই চুম্বক পাহাড়ের মত আকর্ষন করে!
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে জামীর মুখ এহসানের মুখের দিকে এগিয়ে এসেছে সেটা সে টেরও পায়নি।
ঊষ্ণ নিঃশ্বাসে এহসানের তন্দ্রা ভেঙে যায়। সে চোখ মেলে। যেন ধ্যানপর্ব শেষে জেগে ওঠা এক যোগী। শান্ত স্বরে বলে, কি হয়েছে জামী?
জামী ওই চোখের দিকে তাকিয়ে পূর্ন সম্মোহিত। ঘোরমুগ্ধ স্বরে বলে-
“তোমার ঐ ঘুম ছোঁয়া দু’টি চোখ
আলীবাবার যাদুগুহা যেন
কখন নিয়েছ টেনে ভেতরে
বুঝি নি…”
এহসান বলে, ও এই ব্যাপার? বোঝোনি ! আর টেনে নিলাম কই? তবে এইবার নিব। বলে সে জামীর মুখ দুহাতে আকর্ষন করে তার ঠোঁটে স্বল্প দীর্ঘ এক চুমু দেয়। এরপর নিজে সোফা থেকে উঠে জামীকে কার্পেটে শুইয়ে দেয়। উপর হতে জড়িয়ে ধরে দুহাত দিয়ে জামীর দুহাত কার্পেটে আটকে বলে – এখন কি বলবে মিস্টার পোয়েট?
জামী আগের স্বরেই বলে,
অধরে অধরা অধর ছুঁয়ে দিলে
সম্মোহিত জেগে ওঠে
যেন সে আজ কবি
জীবনানন্দ-
এহসান হো হো করে হেসে বলে , আবারো কবিতা? তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো –আমাকে না কবিতা ?
জামীও হেসে ফেলে। বলে, কবিতা।
এহসান কৃত্রিম রাগের ভান করে বলে এই নিয়ে আজ তুমি তিনটা অপরাধ করলে।
-তিনটা? কি কি!
-প্রথমত আমাকে বাইরে দাড় করে রেখেছিলে অনেকক্ষণ। তারপর দরজা খুলে দিয়েই উধাও হলে, কোন হাই হ্যালো নাই। আর শেষটা হল যা এখন বললে।
জামী হি হি করে হেসে উঠে। এহসান বলে,
-না না হাসলে হবে না। তোমার অনেক শাস্তি পাওনা। বলেই সে এক হাত দিয়ে জামীর দুহাত মেঝেতে আটকে আরেক হাত তার শর্টসের ভেতর চালান করে দেয়। একটু দুর্বল জামী বাঁধা দিয়ে বলে- এখন নয় প্লীজ। অফিসের জামা তো ছাড়ো। ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর।
এহসান কি ভেবে জামীর শর্টস থেকে হাত বের করে আনে। আবার সে দুহাত দিয়ে জামীর দুহাতের উপর চেপে ধরে তার গলা ও কাঁধের সন্ধিস্থানে ড্রাকুলা টাইপ চুমু দিতে দিতে বলে- ঠিক আছে। তবে এক শর্তে।
-কি শর্ত
-আমার সাথে তোমাকেও শাওয়ার নি তে হবে
-আমি তো মাত্র শাওয়ার নিলাম।
-তাহলে তুমি কি চাও তোমার আবার শাওয়ার নেয়ার মত অবস্থা করি। এহসান দুষ্টুমি মাখা স্বরে বলে । বিপদ টের পেয়ে জামী প্রবল বেগে মাথা না ড়ে বাচ্চাদের মত।
-না না । এখন না। এখন না।
এহসান জামীকে আরো চেপে ধরে,
-এত বেশী কথা বলো কেন? চুপ করো
শব্দহীন হও
-উপস… তুমি শঙ্খ ঘোষের কবিতাও জানো?
-কেন কবিতা জানার অধিকার কি শুধু তোমার একলা নাকি? আমার জানতে নেই?
-না জানতে নেই। কবিতা সবার জন্য না।
-বক বক করতেই থাকবে, না ?
-আচ্ছা ঠিক আছে – শঙ্খ ঘোষের কবিতার উসিলায় তোমার অন্যায় আব্দার মেনে নিলাম।
-দ্যাটজ লাইক মা গুড বয়।
এহসান জামীকে ছেড়ে দিতে দিতে বিজয়ের হাসি হেসে বলে।

৩।

-আজ অনেক কষ্ট করে আগে বের হয়েছি জামী তোমার এখানে আসবো বলে।
-থ্যাংক্স
-জব করতে আমার একদম ভালো লাগে না
-কারোরই ভাল লাগে না
-তারপরও , আগে এত খারাপ লাগত না। নতুন বস শালা একটা খবিশ আর এক চোখা ।
তারপর একটু থেমে বলে, শালা একটা লুইচ্চা।
জামী বুঝতে পারে এহসানের বসের আজ কপাল খারাপ। বিশ্বের সব খারাপ তকমাগুলো তার জুটবে। তবে সে এহসানকে বাঁধা দেয় না। এহসান সাধারনত এত আপসেট থাকে না। বোঝাই যায় সে অনেক প্রেসারে আছে। এই প্রেসার কোথাও রিলিজ হওয়া দরকার। তাই সে হয়তো জামীর কাছে এসেছে – যেখানে সে তার একজন সহমর্মী পাবে, যাকে সে তার মনের কথা বলে নিজেকে হালকা করতে পারবে, যেখানে সে শুধুই তার নিজস্ব সময় কাটাতে পারবে। এজন্য মনে মনে জামী এহসানের খবিশ, একচোখা আর লুইচ্চা বসকে একটা ধন্যবাদ জানায়।
তবে তার একটু মন খারাপও হয়।
এতক্ষন এসেছে সে অথচ একবারও জামীকে জিগ্যাসা করে নি সে কেমন আছে? সারাক্ষন শুধুই নিজের কথা, নিজের সমস্যা , নিজের দুঃখ। জামীর ব্যাপারে যেন তার কোন কিছুই জানার নেই।
জামীর এ সময়ে খুব একা ও অসহায় লাগে। কিন্তু তার এই মনোভাব সে এহসানকে দেখাতে চায় না। এসব বলে বা জানিয়ে এহসানকে সে কখনোই অপ্রস্তুত করতে পারবে না।
শাওয়ার ছাড়া আছে আর এহসান তার দিকে পিঠ দেয়া। এহসান তাই জামীর মৃদু দীর্ঘশ্বাস বুঝতে পারে না। তার হতাশ ও দুখী চেহারা দেখতে পায় না।
জামীও সাবান দিয়ে এহসানের পিঠ দলে দিতে দিতে এহসানের প্রতিটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে চেষ্টা করে ও সায় দিতে থাকে।
শাওয়ার হওয়ার পর এহসান আর জামী ভরপেট লাঞ্চ করে। এরপর চা পর্ব শেষ হলে এহসান বলে , “চা খেলাম। এখন আমার টা লাগবে।“
-সেটা কি?
-ম্যাসাজ। মেরুদণ্ডের গোড়ায় খুব ব্যাথা।
জামী বললো, ঠিক আছে।
সে বুঝে নিল এটা আসলে আরো গভীর কিছু করার শুরু।
জামীর সেই চুড়ান্ত কিছুর জন্য মানসিক প্রস্তুতি আছে। ইন ফ্যাক্ট সে সেই মাহেন্দ্রক্ষনের জন্যই অপেক্ষা করছে।
এহসানকে সে বিছানায় উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে Weleda ব্র্যান্ডের ম্যাসাজ অয়েল পুরো পিঠে প্রথমে হাল্কা স্প্রে করে নেয়। তারপর সে ধীরে ধীরে ম্যাসাজ করা শুরু করে। প্রথমে ঘাড়, গলা, পিঠ, মেরুদণ্ড, নিতম্ব, ঊরু, পায়ের পাতা। সবশেষে করবে মাথা ও কপাল।
এহসান দারূণ পুরুষালী। শরীর বেশ শক্ত আর চামড়াও পুরু। ভি শেপের পিঠ, চ্যাপ্টা কোমড়, মেদহীন পেট, উত্তল নিতম্ব, সতেজ গ্রীক পিলারের মত ঊরু – আহা কি আদিম এক আকর্ষণ এই নগ্ন শরীর জুড়ে! জামী মুগ্ধ হয়ে দেখে আর খুব যত্নের সাথে ঘাড়, পিঠ, মেরুদণ্ড, মেরুদণ্ডমূল তার তর্জনী, বুড়ো আঙুল আর হাতের তালু দিয়ে ম্যাসাজ করতে থাকে। আর ভিতরে ভিতরে সে টের পায় তার শরীর জেগে উঠছে। এ শরীর কামনার শরীর। এ শরীরের রক্ত তখন আর রক্ত থাকে না, শরাব যেন। বাস্তবকে মনে হয় ঘোরের মত। সমস্ত সংস্কার, বিধি-নিষেধ একদিকে আর এই কামনার শরীর একদিকে।
অনেক আরাম পেয়ে এহসান তন্দ্রাঘোরে চলে যায়। আর জামী ক্লান্ত হয়ে এহসানের পিঠের সাথে তার বুক মিলিয়ে শুয়ে পড়ে। একসময় এহসান জামীর হাতের তালুতে চাপ দেয় ও মৃদু মোচড়াতে থাকে। তারপর হঠাত করে জামীর শরীর তার নীচে নিয়ে সারামুখে চুমু দিতে থাকে। তার নাকে নাক ঘষতে ঘষতে গাঢ় কন্ঠে বলে –
-তুই এত ভাল কেন জামী?
এহসান যখন এক্স রেটেড রোমান্টিক মুডে থাকে তখন সে জামীকে তুই তুই করে বলে। জামী নির্লিপ্ত ভাবেই উত্তর দেয়,
-কারণ আমি তোমার আয়না
-আর তোর চোখ দুটি এত সুন্দর কেন? এত স্বপ্ন স্বপ্ন ভাব!
-যার হৃদয়ে কবিতা, তার চোখ হয় স্বপ্ন ছোঁয়া
-আবার কাব্য। তুই কাব্য করা ছাড়া কথা বলতে পারিস না?
-পারি তবে তুমি যেমন রোমান্টিক মুডে থাকলে তুই করে ডাকো আমিও মুডে থাকলে কাব্য করি।
-কাব্য তো করবে কবি। তুই কি কবি?
-হু
-আচ্ছা কবি সাব আমার ব্যাপারে কিছু কাব্য কর তো
-কারো দেহের বর্ণ ভালো, কারো দেহের গন্ধ
তোমার বন্ধু সবই ভালো, দেহের প্রতি রন্ধ্র!
জামী হেসে দেয়। আর এহসান তখন কৃত্রিম রাগের ভঙ্গী করে তার নির্লোম মসৃন বুকে চাপ দেয়।
-আমার জন্য এত সস্তা লাইন। ভালো কিছু বল।ভালো কিছু বল । না হলে আজ মেরেই ফেলবো।
-উহ বলব বলব, ব্যাথা পাই। আগে আদর কর। তারপর।
এহসান তখন জামীর বুকের দুই কিসমিসে গাঢ় সিক্ত চুমু দিয়ে বলে,
-আদর করলাম। এখন ভালো কিছু বল যাতে আমার মন ভালো হয়ে যায়
জামী তখন এহসানকে বুকে টেনে নিয়ে আরো গাঢ় আলিংগনে বেঁধে বলে,
-তুমিই আমার প্রিয় সুখ
তুমিই প্রিয় দুঃখ
মিলনে তুমি স্বর্গ আনো
বিরহে করো পূর্ণ।
-আর
-এইসব মধুনদী
এইসব ভালো থাকাথাকি
চোখ ভরা অনুরাগ
শরীরে শরীরে ভাসাভাসি
ভালোবাসি ভালোবাসি…
এহসান অবাক হয়ে কিছুখন তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে,
-এসব কি সত্যিই তোর নিজের বানানো?
-হুম। তোমার জন্য।
-কখন বানাস এসব
-যখন খুব একা থাকি, তোমাকে ভাবি অথবা …
-অথবা?
– অথবার পরেও থাকে কিছু,
তুমি নই, আমি নই
কিন্ত কতিপয় অশরীরি জুজু –
ভালোবাসা, ঘৃণা , বিরহ,
অবহেলার তিক্ত স্রোত,
কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না,
মধুর আরাধনার সেই সব কথা,
তাই তো বলি না, যা থাকে ‘অথবা’র পরে,
সেইসব অন্যকিছু
-হাহাহা, আবার হেঁয়ালি, এনিওয়ে, হেঁয়ালি করে ফাঁকি দেয়া যাবে না… আমার মাথা মালিশ করবে কে?
-কেন আমি – এই বলে জামী হেসে দেয়। তারপর বসে এহসানের মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে কপালে একটা চুমু দেয় গভীর আবেগে। তারপর চুলে বিলি কাটতে থাকে দশ আঙুলে। আঙুল তো নয় যেন মায়াতুলি! বিলি কাটা নয়, পরম মমতায় কেউ যেন ছবি আঁকছে ।
এহসান চোখ বন্ধ করেই বলে,
-তুই আমাকে এত ভালোবাসিস কেন?
-কিভাবে বুঝলি যে আমি তোকে অনেক ভালোবাসি
-তোর প্রতিটি স্পর্শ, মৃদু শ্বাসের শব্দ, বুকের স্পন্দনই তা বলে দিচ্ছে। এত যত্ন নিয়ে আদর আমাকে কেউ করে না। আমি জানি এত ভালো ও আমাকে কেউ বাসে না।
-তোর বউও না?
এই প্রশ্ন শুনে এহসান কিছুক্ষন চুপ থাকে। হঠাত পুরো পরিবেশ হয়ে উঠে গম্ভীর। জামীর কোল থেকে মাথা সরিয়ে সে উঠে বসে। এই এহসান আর জামীর প্রেমমুগ্ধ এহসান নয়। এই এহসান বুনো ও বেপরোয়া। জামীর চোখে চোখ রেখে স্পষ্ট স্বরে বলে,
-না, আমার বউও না। খুশী হয়েছিস শুনে? আমার বউ আমাকে ভালোবাসে না শুনে খুব মজা পাচ্ছিস?
-হুম পাচ্ছি। জামীর ঠোঁটের কোনে বাঁকা একটা হাসি। এহসান তা দেখে তখন ক্রূর কঠিন কন্ঠে বলে,
-আরো অনেক কথা বলতে পারি যা শুনে তুই আরো মজা পাবি – তোর মত ল্যাওড়াখোরদের দশটা ভাতার থাকার যে মজা তার চেয়েও বেশী – শুনতে চাস তা? তারপর সে জামীর দুই কাঁধ হাতে চেপে ধরে চাপা স্বরে ফিসফিস করে বলে, তবে বাস্তব হলো তুই আমাকে তার চেয়ে বেশী ভালোবাসলেও কিংবা আমি তোকে আমার বউ এর চেয়ে বেশী ভালোবাসলেও এমন কি আমার বউ আমাকে ঘৃণা করলেও তুই কখনোই আমার বউ এর সমতুল্য হবি না বা তোর প্রায়োরিটি কখনোই আমার বউ এর থেকে বেশী হবে না – কারণ তার সাথে আমার সম্পর্ক একটা সামাজিক সম্পর্ক। বংশ রক্ষার সম্পর্ক। এই সম্পর্কের স্বীকৃতি আছে। এটা যত তাড়াতাড়ি মেনে নিবি তা ততোই আমাদের জন্য ভালো।
এহসানের হাত তখন জামীর কাঁধ থেকে সরে এসে গলায় চাপ দিচ্ছে।
জামী শুধু বলে, হাত সরাও। ব্যাথা পাচ্ছি। তারপর নিজেই এহসানের দুহাত সরিয়ে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে আসে। জানালার পাশে দাঁড়ায়। কাঁচের ওপাশে জামীর দগ্ধ হতে থাকা পরাজিত হৃদয়ের মত আকাশ। গোধুলীর আলোয় সেই আকাশে এখন হোলি খেলার উৎসব। বেদনার হোলি। সেই অস্তগামী ম্লান আলোয় জামীকে খুব দুখী দেখায়। একটু পরেই সে কাঁধে পুরুষালী দুই ঠোঁটের সিক্ত স্পর্শ পায়। সেই পুরুষ বলে,
-সরি। আমি তোকে কখনোই ব্যাথা দিতে চাই নি। কিন্তু তুই কেন আমাকে এমন কিছু মনে করিয়ে দিস যা আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়? আমার অসহায়ত্ব আর আমার মধ্যে থাকা প্রতারকের রূপ, চোরের মত পলায়নপর এক রূপ উলঙ্গভাবে প্রকাশ করে? তুই জানিস না আমিও সুখে নেই, আমিও ভীষণ ক্লান্ত! If you don’t understand me then to whom I can seek that… tell me!
জামী একটু চুপ থেকে বলে,
-তোমার মনে আছে একটু আগে আমি ‘অথবা’ বলে হেঁয়ালি করেছিলাম।
-হুমম, মনে আছে।
-আসল সত্যি হলো আমার যখন খুব মরে যেতে ইচ্ছে করে তখন নিজের মনেই কবিতা বানাই, মনে মনে ভাবি আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি আর তুমিও আমাকে অনেক ভালোবাসো। আমরা দু’জন আর অন্য দশটি প্রেম-যুগলের মতই!
-আমরা দু’জন তো প্রেমিক যুগলই। হয়তো অন্য দশ জনের মত নয়। তাতে কি?
-তাতে অনেক কিছু – অনেক সংশয়, অনেক সন্দেহ, অনেক শংকা! তোমার সংসার, স্বীকৃতি আর সমাজ আছে। তাই তুমি কখনো আমার মানসিক অবস্থান বুঝো না বা বুঝবে না। এতক্ষন এসেছো একবারও জিগ্যেস করেছো আমি কেমন আছি? মনে আছে কবে তুমি আমাকে শেষবারের মত বলেছিলে ভালোবাসি?
-আমি বলি বা না বলি, তুই তো জানিস আমি তোকে ভালোবাসি। অনেক ভালোবাসি। তুই আমাকে যতটুকু বাসিস তার চেয়েও বেশী। আমার অবস্থানে থেকে আমি তা প্রকাশ করতে পারি না, বলতে পারি না কিন্তু তুই যতটুকু জানিস তার চেয়েও আমি তোকে বেশী ভালোবাসি। অনেক বেশী। তুই কি ভাবিস আমি তোর কাছে শুধু অফিসের ঝামেলা চাপ শেয়ার করতে, স্বার্থপরের মত ম্যাসাজ নিতে কিংবা বউয়ের ভালোবাসাহীনতার কারনে আসি? সেটা ঠিক নয়! আমি তোর কাছে আসি, তোর স্পর্শ চাই কারন তোকে আমার প্রয়োজন আর যে কারো চেয়ে বেশী। তোর অনেক হতাশার আমি সংগী হতে পারি না। কিন্তু তোর কোন সংকটে আমাকে ডেকে দেখবি আমি অবশ্যই তোর পাশে থাকবো। অনেক সুখে হয়তো আমি তোর কাছে আসি না বা আমার সফলতায় তোর অবদান আমি প্রকাশ্যে বলতে পারি না। কিন্তু আমি আর আমার খোদা তো জানে তোর অবদান। তা প্রকাশ করতে পারি না, এজন্য আমাকে তুই কাপুরুষ, স্বার্থপর বলতে পারিস। কিন্তু তোকে ভালোবাসি না বা তোর প্রতি ভালোবাসায় আমার কোন সন্দেহ সংশয় আছে এটা পুরো মিথ্যা। পুরো মিথ্যা।
সবল শক্ত এহসান এসময় আবেগে কাঁপতে থাকে।
জামী আর পারে না। এহসানকে জড়িয়ে ধরে সে হুহু করে কেঁদে ফেলে।
দু’জনই জেনে যায় এই কান্না অব্যখ্যাত কষ্ট ও মানবজন্মের সীমাবদ্ধতা জয়ী সুখের কান্না। প্রেমাস্পদের অনুরাগের মিষ্টি স্পর্শে তার জন্ম।
আলো আঁধারে ভরে যাওয়া ঘরে তখন এক মধুর কষ্টনদী। সেই নদীর সুরেলা স্রোতে দু’জন দু’জনের শরীরে ডুবে ও ভেসে যেতে থাকে।

৪।

জামীর যখন ঘুম ভাঙে তখন রাত ন’টা। এহসান শাওয়ার শেষে কাপড় পড়ে নিচ্ছে।
বললো, বন্ধু আজ যাই।

জামী কিছু বলে না। কোন বিদায়ের সময়ই সে কিছু বলে না। কেমন এক ঘোরের মধ্যে থাকে।
এখন বোধ হয় শুক্লপক্ষ। সারা ঘরে চাঁদের আলোর ছড়াছড়ি। সেই আলোয় এলিয়ে শুয়ে থাকা নগ্ন জামীকে অলীক মানুষের মত মনে হয়।
এহসান জামীর পাশে বসে কপালে চুমু দিয়ে চলে যেতে নিলে জামী এহসানের কোমড় জড়িয়ে ধরে তার কোলে মুখ গুঁজে। চোখে তার কান্নার জল। সে জল যখন এহসান মুছিয়ে দিতে নেয় জামী তা বিকর্ষন করে বলে,
-“কি করে এমন হয়, যাকে এত ভালোবাসি, তাকেই আবার ভালোবাসি না!
সারাক্ষণ যার পথ চেয়ে থাকি তাকেই আবার চলে যাওয়ার জন্য পথ দেখিয়ে দিতে হয়।“
জামী এমন ভাবে তা বলে যে এহসানেরও কান্না পায়। সেটা সে বুঝতে না দিয়ে জামী’র ভেজা দুচোখে আলতো করে চুমু দিয়ে তার চোখে নিজের সজল চোখ রেখে বলে, যাওয়ার সময় কাঁদতে নেই। ছিঃ। আমার বুঝি খারাপ লাগে না?
এহসান চলে যায়।

রুপোলী আলোর শহর তখনও অনেক ব্যস্ত। আজ বছরের শেষ দিন। পুরনো বছরকে বিদায়ে ও নতুন বছরকে বরণ করে নিতে সারা শহরে অনেক আয়োজন।
অনেক আলো ও শব্দের মধ্যে করুণ সুর হয়ে হাঁটতে থাকে এহসান। তার মোবাইল ফোন বাজতে থাকে। বউএর ফোন। সে টের পায় না। তার মন পড়ে আছে পিছনে ফেলে আসা এক নিঃসঙ্গ কামরায় চিত হয়ে শুয়ে থাকা নগ্ন পুরুষে, দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে নিরুত্তাপ চোখে যে দেখছে এক
সবজান্তা আসমান, মাঝে শুধু পাঁজরের হাড়ের মত জানালার শিক -বাতাসে জোছনা দুলে উঠলে নগ্ন পুরুষ বলে- হে আকাশ বলতো, আমারে কে সত্যিই ভালোবাসে?

তেপান্তরের মাঠের মত বিশাল আকাশ মোনালিসার রহস্য হাসি হাসে
যেন সে এর উত্তর জানে কিন্তু বলবে না।

8 thoughts on “বকুল আহমেদ লেখা বিশেষ গল্পঃ “কবি ও তার দহণকাল”

  1. মন আর বাস্তবতা কে যখন ছুয়ে যায় কোন লেখা তাই হল ত্রিপ্তির সঙ্গা.. ধন্যবাদ লেখক।

    Like

  2. লেখকের কবিসত্তার পুর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গল্পটিতে। সমকামী জীবনের জটিলতাকে শব্দ আর কাব্যের মায়াময় গাঁথুনি দিয়ে উপস্থাপনের এই সার্থক প্র্যাসের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই Bokul Ahmed কে

    Like

  3. এভাবেই দিন যায় কারো পথ চেয়ে। একা থাকতে হয়। শেষে মুখাগ্নি দিতেও কাউকে পাওয়া যায় না।

    Like

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s